ভূমিকা
হিন্দু বিশ্বতত্ত্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রকৃতি সম্পর্কে কল্পিত সবচেয়ে ব্যাপক ও পরিশীলিত চিন্তন পদ্ধতিগুলির একটি। যেখানে বহু প্রাচীন পরম্পরা একটি একক সৃষ্টি-ঘটনা ও তার পরবর্তী রৈখিক ইতিহাস কল্পনা করেছে, সেখানে হিন্দু ঋষিরা অকল্পনীয় বিশালতার চক্রাকার কাল পরিকল্পনা করেছিলেন — এক ব্রহ্মাণ্ড যা শ্বাস নেয়, কোটি কোটি বছর ধরে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের শাশ্বত ছন্দে প্রসারিত ও সংকুচিত হয়।
এই মহাজাগতিক দৃষ্টি কোনো একটি গ্রন্থে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ও ইতিহাসে ক্রমশ উন্মোচিত হয়। যে চিত্র প্রকাশ পায় তা গভীর কাল, দোদুল্যমান ব্রহ্মাণ্ড ও বহুবিশ্বের আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
নাসদীয় সূক্ত: সৃষ্টির গান
বিশ্বের যেকোনো ধর্মগ্রন্থে দার্শনিকভাবে সম্ভবত সবচেয়ে সাহসী সৃষ্টি-বর্ণনা নাসদীয় সূক্ত (ঋগ্বেদ ১০.১২৯)। একটি নিশ্চিত সৃষ্টিকাহিনী উপস্থাপনের পরিবর্তে এটি মৌলিক অনিশ্চয়তা দিয়ে শুরু হয়:
“নাসদাসীন্নো সদাসীত্তদানীং নাসীদ্রজো নো ব্যোমা পরো যৎ”
“তখন অসৎও ছিল না, সৎও ছিল না; অন্তরীক্ষের লোকও ছিল না, তার পরে আকাশও না।”
সূক্তটি সাতটি শ্লোকে গভীরতর রহস্যের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে এবং এই অসাধারণ পঙ্ক্তিতে সমাপ্ত হয়:
“এই সৃষ্টি যেখান থেকে উৎপন্ন হল — তিনি একে রচনা করলেন কি না — পরম আকাশে যিনি সর্বোচ্চ দ্রষ্টা, তিনিই জানেন। অথবা হয়তো তিনিও জানেন না।”
এটি অজ্ঞেয়বাদ নয় বরং পবিত্র কাব্যের স্তরে উত্থিত বৌদ্ধিক সততা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই সূক্তকে “মানব চিন্তনের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা” বলে অভিহিত করেছিলেন।
হিরণ্যগর্ভ: সুবর্ণ ভ্রূণ
একটি অধিকতর মূর্ত সৃষ্টি-বর্ণনা হিরণ্যগর্ভ সূক্ত (ঋগ্বেদ ১০.১২১)-এ আবির্ভূত হয়:
“হিরণ্যগর্ভঃ সমবর্ততাগ্রে ভূতস্য জাতঃ পতিরেক আসীৎ”
“আদিতে হিরণ্যগর্ভ প্রকাশিত হলেন; জন্মগ্রহণ করে তিনি সকল বিদ্যমানের একমাত্র প্রভু হলেন।”
মনুস্মৃতি (১.৫-১৩) বিস্তারিত বর্ণনা দেয়: স্বয়ম্ভূ প্রথমে জল সৃষ্টি করলেন, একটি বীজ স্থাপন করলেন যা সুবর্ণ অণ্ড হল, এবং তার মধ্যে স্বয়ং ব্রহ্মার জন্ম হল। এক মহাজাগতিক বছর পরে ব্রহ্মা অণ্ডটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করলেন — এক ভাগ স্বর্গ হল, অন্য ভাগ পৃথিবী।
ব্রহ্মার সৃষ্টি: পদ্মজন্মা স্রষ্টা
পৌরাণিক বিশ্বতত্ত্বে সৃষ্টি শুরু হয় যখন বিষ্ণু কারণ সাগরে শেষ (অনন্ত) নাগের উপর যোগনিদ্রায় শায়িত থাকেন। বিষ্ণুর নাভি থেকে একটি পদ্ম জন্মায়, এবং সেই পদ্মে ব্রহ্মার জন্ম হয়।
ব্রহ্মার সৃজনপ্রক্রিয়া বিষ্ণু পুরাণ (১.৪-৫) ও ভাগবত পুরাণ (৩.১০)-এ বর্ণিত:
- মহৎ (মহাজাগতিক বুদ্ধি) সর্বপ্রথম আবির্ভূত হয়
- অহংকার তিন গুণে বিভেদিত হয়
- তমঃ থেকে পাঁচ সূক্ষ্ম তত্ত্ব (তন্মাত্রা) ও পাঁচ স্থূল তত্ত্ব (মহাভূত) উৎপন্ন হয়
- সত্ত্ব থেকে মন, দশ ইন্দ্রিয় ও অধিষ্ঠাতা দেবতা উৎপন্ন হয়
- এগুলি মিলিত হয়ে ব্রহ্মাণ্ড (মহাজাগতিক অণ্ড) গঠন করে
তিরুবনন্তপুরমের পদ্মনাভস্বামী মন্দিরে বিষ্ণুর অনন্তশায়ী মূর্তি এই মহাজাগতিক দৃশ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত ভাস্কর্য প্রতিনিধিত্ব।
যুগ প্রণালী: মহাজাগতিক কাল-বিভাগ
হিন্দু বিশ্বতত্ত্ব সময়কে চারটি পুনরাবর্তী যুগে বিভক্ত করে:
| যুগ | মেয়াদ (বছর) | ধর্ম | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| সত্য (কৃত) | ১৭,২৮,০০০ | ৪/৪ (সম্পূর্ণ) | সত্য, সদ্গুণ, দুঃখহীন |
| ত্রেতা | ১২,৯৬,০০০ | ৩/৪ | ধর্মের অবক্ষয় আরম্ভ; রামের যুগ |
| দ্বাপর | ৮,৬৪,০০০ | ২/৪ | আরও অবক্ষয়; কৃষ্ণের যুগ |
| কলি | ৪,৩২,০০০ | ১/৪ | কলহ, অজ্ঞান, আধ্যাত্মিক অন্ধকার |
চারটি যুগ মিলে একটি মহাযুগ (৪৩,২০,০০০ বছর)। পরম্পরাগত গণনা অনুসারে আমরা বর্তমানে কলিযুগে আছি, যা ৩১০২ খ্রি.পূ.-তে ভগবান কৃষ্ণের প্রস্থানের সঙ্গে আরম্ভ হয়েছিল।
ভগবদ্গীতা (৪.৭-৮)-র প্রতিশ্রুতি — “যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত” — যুগচক্রকে মুক্তিদায়ক মাত্রা প্রদান করে।
কল্প, মন্বন্তর ও ব্রহ্মার আয়ু
এক হাজার মহাযুগ মিলে একটি কল্প (৪.৩২ বিলিয়ন বছর), যা ব্রহ্মার এক দিনের সমান। ব্রহ্মার রাত্রিও সমান দীর্ঘ। ব্রহ্মার পূর্ণ দিন-রাত্রি চক্র ৮.৬৪ বিলিয়ন বছর — পৃথিবী ও সূর্যের বয়সের আধুনিক অনুমানের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।
প্রতিটি কল্প ১৪ মন্বন্তরে বিভক্ত। বর্তমান মন্বন্তর সপ্তম, বৈবস্বত মনুর অধীনে।
ব্রহ্মার মোট আয়ু ১০০ ব্রহ্মা-বছর (৩১১.০৪ ট্রিলিয়ন মানব-বছর)। ভাগবত পুরাণ (৩.১১.৩৩-৪০) অনুসারে বর্তমান ব্রহ্মা প্রায় ৫১ বছর বয়সী।
প্রলয়: মহাজাগতিক বিলয়
হিন্দু বিশ্বতত্ত্ব বিভিন্ন ধরনের প্রলয় চিহ্নিত করে:
নৈমিত্তিক প্রলয় (পর্যায়ক্রমিক বিলয়)
প্রতিটি কল্পের (ব্রহ্মার দিন) শেষে তিনটি নিম্ন লোক অগ্নি ও জলে ধ্বংস হয়। ব্রহ্মা জাগলে সৃষ্টি পুনরায় আরম্ভ হয়।
প্রাকৃতিক প্রলয় (তাত্ত্বিক বিলয়)
ব্রহ্মার ১০০ বছরের আয়ুর শেষে সম্পূর্ণ ব্রহ্মাণ্ড প্রকৃতিতে (মূল প্রকৃতি) বিলীন হয়।
আত্যন্তিক প্রলয় (চরম মুক্তি)
এটি মহাজাগতিক বিলয় নয়, ব্যক্তিগত আত্মার সংসার থেকে চূড়ান্ত মুক্তি — মোক্ষ।
নিত্য প্রলয় (নিরন্তর বিলয়)
ভাগবত পুরাণ দৈনন্দিন জীবনে জন্ম ও মৃত্যুর নিরন্তর প্রবাহকেও প্রলয়ের একটি রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বিষ্ণুর যোগনিদ্রা ও বহুবিশ্ব
পুরাণে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা একমাত্র বহুবিশ্ব ধারণা হিসেবেই বর্ণনা করা যায়। ভাগবত পুরাণ (৩.১১.৪১) বলে যে মহাবিষ্ণুর (কারণোদকশায়ী বিষ্ণু) রোমকূপ থেকে অসংখ্য ব্রহ্মাণ্ড জলের বুদবুদের মতো নির্গত হয়, প্রতিটিতে তার নিজস্ব ব্রহ্মা, নিজস্ব ছায়াপথ ও নিজস্ব কালরেখা আছে।
ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণে এক প্রসঙ্গে ইন্দ্র, তার স্বর্গরাজ্যে গর্বিত, বালক রূপে বিষ্ণুর সাক্ষাৎ পান। পিঁপড়ের সারির দিকে দেখিয়ে বালক জানান যে প্রতিটি পিঁপড়ে পূর্ব মহাজাগতিক চক্রে একজন ইন্দ্র ছিল।
মেরু পর্বত ও ব্রহ্মাণ্ডের গঠন
পৌরাণিক ভূগোল ব্রহ্মাণ্ডকে একচক্রীয় বলয়ের ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্ণনা করে। কেন্দ্রে মেরু পর্বত (মহাজাগতিক অক্ষ), সাতটি বলয়াকার দ্বীপ ও সাতটি সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই ঊর্ধ্বাধর মহাজাগতিক চিত্রায়ণ কেবল ভৌত স্থানের নয়, চেতনার অবস্থাসমূহের মানচিত্র।
আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সাদৃশ্য
যেমন কার্ল সেগান কসমস (১৯৮০)-এ বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন: “হিন্দু ধর্ম বিশ্বের মহান ধর্মগুলির মধ্যে একমাত্র যা এই ধারণায় নিবেদিত যে মহাজাগতিক নিজেই এক বিশাল, প্রকৃতপক্ষে অসীম সংখ্যক মৃত্যু ও পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে যায়।”
বাংলার দার্শনিক পরম্পরায়, জগদীশ চন্দ্র বসু প্রাণের চক্রাকার প্রকৃতি নিয়ে তাঁর গবেষণায় হিন্দু বিশ্বতত্ত্বের চক্রাকার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন বলে জানা যায়।
উপসংহার
হিন্দু বিশ্বতত্ত্ব একটি নয় বরং একাধিক সৃষ্টি-মিথ উপস্থাপন করে — একটি স্তরিত, বহুস্বরীয় দর্শন যেখানে দার্শনিক জিজ্ঞাসা (নাসদীয় সূক্ত), পৌরাণিক আখ্যান (ব্রহ্মার পদ্মজন্ম) এবং গাণিতিক নির্ভুলতা (যুগ-গণনা) সহাবস্থান করে ও পরস্পরকে পরিপূরণ করে। এর গভীরতম স্তরে এটি শেখায় যে সৃষ্টি একটি একবারের ঘটনা নয় বরং এক শাশ্বত প্রক্রিয়া — এবং মহাজাগতিক নাটক প্রত্যক্ষকারী চৈতন্যই সেই উৎস যেখান থেকে নাটকের উৎপত্তি।