মহাভারত (মহাভারত, “ভরত বংশের মহান গাথা”) প্রাচীন ভারতের দুটি মহান মহাকাব্যের একটি, যার রচনা ঐতিহ্যগতভাবে ঋষি ব্যাসের নামে আরোপিত। এক লক্ষেরও অধিক শ্লোকে (আনুমানিক ১৮ লক্ষ শব্দ) সমৃদ্ধ এই গ্রন্থ বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্য — হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসির সম্মিলিত দৈর্ঘ্যের প্রায় দশ গুণ। এর কেন্দ্রে রয়েছে একটি রাজবংশের দুই শাখা — পাণ্ডব ও কৌরবদের — মধ্যে কুরুক্ষেত্রের পবিত্র ভূমিতে সংঘটিত এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের কাহিনি। তবে মহাভারত কেবল যুদ্ধবৃত্তান্ত নয়: এটি ধর্ম, দর্শন, পুরাকথা, রাজনীতি ও আধ্যাত্মিক উপদেশের এক বিশ্বকোষীয় সংকলন, যার সম্পর্কে স্বয়ং মহাকাব্যে বলা হয়েছে — যদিহাস্তি তদন্যত্র যন্নেহাস্তি ন তৎ ক্বচিৎ — “যা এখানে আছে তা অন্যত্রও পাওয়া যেতে পারে; যা এখানে নেই তা কোথাও নেই” (আদি পর্ব ১.৫৬.৩৩)।
রচয়িতা: ব্যাস ও রচনাপ্রক্রিয়া
ব্যাস (কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন) হিন্দু ঐতিহ্যের সর্বাধিক শ্রদ্ধেয় ঋষিদের অন্যতম। তাঁকে শুধু মহাভারত রচনার কৃতিত্বই দেওয়া হয় না, বরং মূল একীভূত বেদকে চারটি অংশে — ঋক্, যজুর্, সাম ও অথর্ব — বিভাজনের জন্য তাঁকে বেদব্যাস উপাধি দেওয়া হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, ব্যাস নিজেই মহাকাব্যের একটি চরিত্র — পাণ্ডব ও কৌরব উভয়ের পিতামহ, মৎস্যকন্যা সত্যবতী ও ঋষি পরাশরের পুত্র হিসেবে যমুনা নদীর একটি দ্বীপে জন্মগ্রহণকারী।
ঐতিহ্য অনুসারে, ব্যাস মহাভারত বর্ণনা করেছিলেন গণেশের কাছে, যিনি লিপিকারের ভূমিকা নিয়েছিলেন — তবে এই শর্তে যে ব্যাস কখনো বর্ণনায় বিরতি নেবেন না। ব্যাসও শর্ত দিয়েছিলেন যে গণেশ প্রতিটি শ্লোক লেখার আগে তার অর্থ বুঝে নেবেন — এমন একটি কৌশল যা ঋষিকে বিশেষ জটিল অংশ রচনার জন্য কিছু সময় দিত। মহাকাব্যটি ব্যাসের শিষ্য বৈশম্পায়ন কর্তৃক রাজা জনমেজয়কে (অর্জুনের প্রপৌত্র) সর্পযজ্ঞকালে এবং পরে কথক উগ্রশ্রবা সৌতি কর্তৃক নৈমিষারণ্যে সমবেত ঋষিদের কাছে পুনর্বর্ণিত।
পুনের ভাণ্ডারকর প্রাচ্য গবেষণা সংস্থা (BORI) ১৯১৯ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত মহাভারতের সমালোচনামূলক সংস্করণ প্রকাশের ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করেছে। পণ্ডিতরা উপমহাদেশ জুড়ে দেবনাগরী, গ্রন্থ, মালায়ালম, শারদা ও অন্যান্য লিপিতে ১,২৫৯-এরও বেশি পাণ্ডুলিপির তুলনা করে প্রক্ষিপ্ত অংশ বাদ দিয়ে প্রায় ৮৯,০০০ শ্লোকের মূল পাঠ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
কাহিনি: বংশবৃত্তান্ত ও ক্রমবর্ধমান সংঘাত
কুরু রাজবংশ
কাহিনিটি হস্তিনাপুরের রাজপরিবারকে কেন্দ্র করে, যারা কিংবদন্তি রাজা ভরতের বংশধর। রাজা শান্তনু নদীদেবী গঙ্গাকে বিয়ে করেন, যিনি তাঁকে পুত্র ভীষ্ম প্রদান করেন — যিনি আজীবন ব্রহ্মচর্য ও সিংহাসনের প্রতি আনুগত্যের ভীষণ প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয়ে বংশের মহান পিতামহ হবেন। পরে শান্তনু সত্যবতীকে বিয়ে করেন, এবং তাঁদের দুই পুত্র — চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য — উভয়েই উত্তরাধিকারী ছাড়া মারা যান। রাজবংশ অব্যাহত রাখতে সত্যবতী ব্যাসকে বিধবা রানিদের সাথে নিয়োগের অনুরোধ করেন: অম্বিকা থেকে ধৃতরাষ্ট্র (জন্মান্ধ) এবং অম্বালিকা থেকে পাণ্ডু (পীতবর্ণ) জন্মগ্রহণ করেন।
ধৃতরাষ্ট্র, অন্ধ হওয়ায় শাসন করতে অক্ষম, এবং রাজ্য পাণ্ডুর কাছে যায়। কিন্তু পাণ্ডুর ওপর নারীসংসর্গে মৃত্যুর অভিশাপ থাকায়, তাঁর পাঁচ পুত্র — যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব — দৈব বরদানে যথাক্রমে ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারদ্বয় থেকে জন্মগ্রহণ করেন। ধৃতরাষ্ট্রের একশত পুত্র — কৌরব — যাদের জ্যেষ্ঠ দুর্যোধন। এই দ্বৈত বংশপরম্পরা — পাঁচ পাণ্ডব ও একশত কৌরব — কেন্দ্রীয় সংঘাতের মঞ্চ তৈরি করে।
দ্যূতক্রীড়া: নৈতিক বিপর্যয়
প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে যুদ্ধে রূপান্তরিত করে সভা পর্বের কুখ্যাত দ্যূতক্রীড়া (পাশাখেলা)। দুর্যোধন, যুধিষ্ঠিরের জাঁকজমকপূর্ণ রাজসূয় যজ্ঞ দেখে ঈর্ষায় দগ্ধ হয়ে, তার মামা শকুনির — জুয়ার মহারথী — সাথে পাণ্ডবদের অপমানিত করার ষড়যন্ত্র করে। যুধিষ্ঠির, ক্ষত্রিয়ধর্মে আবদ্ধ যে চ্যালেঞ্জ কখনো প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়, আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।
বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গভীর নৈতিক সংকটে, যুধিষ্ঠির — সত্য ও ধর্মের মূর্তিমান রূপ — সবকিছু হেরে যান: সম্পদ, রাজ্য, ভাইয়েরা, নিজে, এবং শেষে দ্রৌপদী, তাঁর পত্নী। যখন দ্রৌপদীকে সভায় টেনে আনা হয় এবং দুঃশাসন তাঁর বস্ত্রহরণের চেষ্টা করে, তিনি উপস্থিত প্রবীণদের কাছে এক ধ্বংসাত্মক আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন: যে ব্যক্তি নিজেই হেরে গেছে এবং আর মুক্ত নয়, সে কি অন্য কাউকে বাজি রাখতে পারে? মহান ভীষ্ম, বিচারের জন্য আহূত হয়ে কেবল বলতে পারেন যে “ধর্ম সূক্ষ্ম” (সূক্ষ্মো ধর্মঃ) — এমন একটি উত্তর যা কঠোর নিয়মপালনের কেন্দ্রে লুকানো ভয়ংকর অস্পষ্টতাকে উন্মোচিত করে।
এই অত্যাচারের সামনে প্রবীণদের — ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ, বিদুর — নীরবতা মহাকাব্যের তীক্ষ্ণতম অভিযোগসমূহের একটি। কেবল বিকর্ণ, একজন অপেক্ষাকৃত গৌণ কৌরব রাজপুত্র, এই কর্মকে অধার্মিক বলে ঘোষণা করার সাহস দেখান। দ্রৌপদী শেষপর্যন্ত দৈব হস্তক্ষেপে (কৃষ্ণের অলৌকিক রক্ষায়) রক্ষা পান, কিন্তু ক্ষত অনিবার্য।
বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গভীর — কাশীরাম দাসের বাংলা মহাভারত থেকে আধুনিক নাটক পর্যন্ত, এই দৃশ্য নারীর মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নে বাঙালি চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত।
পাণ্ডবদের তেরো বছরের নির্বাসন — বারো বনে ও এক অজ্ঞাতবাসে — হয়, যার পরেও দুর্যোধন পাঁচটি গ্রামও ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে: “আমি তাদের সুঁচের ডগা রাখার মতো জমিও দেব না” (উদ্যোগ পর্ব ১২৬.২১)।
আঠারো দিনের যুদ্ধ
সন্ধি-আলোচনা ব্যর্থ হলে, দুই সেনা কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে আঠারো দিনের যুদ্ধের জন্য সমবেত হয় যা যোদ্ধাদের সম্পূর্ণ একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করবে। ঐতিহ্য অনুসারে কৌরব পক্ষে এগারোটি অক্ষৌহিণী ও পাণ্ডব পক্ষে সাতটি অক্ষৌহিণী সেনা।
যুদ্ধ ক্রমান্বয়ে সেনাপতি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে: ভীষ্ম প্রথম দশ দিন কৌরব সেনার নেতৃত্ব দেন, শিখণ্ডীর আড়ালে অর্জুনের তীরে পতিত হন। দ্রোণ পরবর্তী সেনাপতি হন এবং এক বিধ্বংসী প্রতারণায় নিহত হন — যুধিষ্ঠির, যিনি কখনো মিথ্যা বলেন না, ঘোষণা করেন “অশ্বত্থামা” (প্রকৃতপক্ষে সেই নামের একটি হাতি) মারা গেছে, যা শুনে দ্রোণ শস্ত্রত্যাগ করেন। কর্ণ, সেই বিয়োগান্তক নায়ক যার প্রকৃত পরিচয় পাণ্ডবদের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হিসেবে অত্যন্ত বিলম্বে প্রকাশিত হয়, ষোড়শ ও সপ্তদশ দিনে সেনাপতিত্ব করেন এবং অর্জুনের হাতে পতিত হন। শল্য শেষ দিনে সংক্ষেপে সেনাপতিত্ব করেন।
যুদ্ধ শেষ হয় ভীম ও দুর্যোধনের গদাযুদ্ধে। ভীম, দ্বন্দ্বযুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করে, দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করেন — দ্রৌপদীর অপমানকালে নেওয়া প্রতিজ্ঞা পূরণ করে, কিন্তু এই প্রশ্ন উত্থাপন করে যে লক্ষ্য কি উপায়কে সমর্থনযোগ্য করে। বিপুল সেনাবাহিনী থেকে মাত্র মুষ্টিমেয় বেঁচে থাকেন: পাঁচ পাণ্ডব, কৃষ্ণ, সাত্যকি, কৃতবর্মা, কৃপাচার্য ও অশ্বত্থামা।
ভগবদ্গীতা: ঈশ্বরের গান
ভগবদ্গীতা (“ভগবানের গীত”), ভীষ্ম পর্বে (অধ্যায় ২৫-৪২) আঠারোটি অধ্যায়ে ৭০০ শ্লোক, মহাভারতের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গ্রন্থ — এবং বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী রচনা। এটি চরম সংকটের মুহূর্তে উদ্ভূত: অর্জুন, তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, রণক্ষেত্র জরিপ করে উভয় পক্ষে গুরু, পিতামহ, মামা, ভাই, পুত্র ও বন্ধুদের দেখেন। শোক ও নৈতিক বিভ্রান্তিতে অভিভূত হয়ে তিনি ধনুক ফেলে দেন।
কৃষ্ণের উত্তর আঠারোটি অধ্যায় জুড়ে হিন্দু দর্শনের সুশৃঙ্খল উপস্থাপনা হিসেবে প্রকাশিত হয়, যেখানে মুক্তির তিনটি পরস্পরসম্পর্কিত পথ (যোগ) উপস্থাপিত:
-
কর্মযোগ (নিষ্কাম কর্মের পথ) — নিজের ধর্ম অনুসারে ফলাসক্তি ছাড়া কর্ম করা। বিখ্যাত উপদেশ: কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন — “তোমার অধিকার কেবল কর্মে, ফলে কখনো নয়” (গীতা ২.৪৭)।
-
জ্ঞানযোগ (জ্ঞানের পথ) — শাশ্বত আত্মা ও নশ্বর দেহের পার্থক্য বোঝা। আত্মা হত্যা করতে পারে না, হত হতেও পারে না (গীতা ২.১৯-২০)।
-
ভক্তিযোগ (ভক্তির পথ) — প্রেম ও শ্রদ্ধায় সকল কর্ম ঈশ্বরে সমর্পণ করা। কৃষ্ণের ঘোষণা: সর্বধর্মান্পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ — “সকল ধর্ম ত্যাগ করে কেবল আমার শরণ নাও” (গীতা ১৮.৬৬)।
গীতা বিশ্বরূপ দর্শনে (অধ্যায় ১১) চরমবিন্দুতে পৌঁছায়, যেখানে কৃষ্ণ তাঁর বিশ্বরূপ প্রকাশ করেন — সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড তাঁর দেহে সমাহিত, সকল সৃষ্টি গ্রাস ও পুনঃসৃজন করছে — অর্জুনকে বিস্মিত ও ভীত করে।
বাংলার ভক্তি ঐতিহ্যে, বিশেষত গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে, ভগবদ্গীতার ভক্তিযোগের শিক্ষা কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বহন করে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গীতার প্রেমভক্তির বাণীকে বাংলায় এক গভীর আধ্যাত্মিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছিলেন।
আঠারো পর্ব
মহাভারত আঠারোটি পুস্তকে (পর্ব) বিভক্ত:
১. আদি পর্ব — উৎপত্তি, বংশবৃত্তান্ত এবং দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর ২. সভা পর্ব — সভাকক্ষ, দ্যূতক্রীড়া এবং নির্বাসনের আদেশ ৩. বন পর্ব — বননির্বাসন, নল-দময়ন্তী ও সাবিত্রী-সত্যবানের কাহিনি ৪. বিরাট পর্ব — রাজা বিরাটের দরবারে অজ্ঞাতবাস ৫. উদ্যোগ পর্ব — ব্যর্থ সন্ধি-আলোচনা ও যুদ্ধপ্রস্তুতি ৬. ভীষ্ম পর্ব — গীতা এবং ভীষ্মের সেনাপত্যে প্রথম দশ দিন ৭. দ্রোণ পর্ব — দ্রোণের সেনাপত্য, অভিমন্যুর বধ ৮. কর্ণ পর্ব — কর্ণের সেনাপত্য ও পতন ৯. শল্য পর্ব — শেষ দিনের যুদ্ধ, দুর্যোধনের পরাজয় ১০. সৌপ্তিক পর্ব — অশ্বত্থামার রাত্রিকালীন সংহার ১১. স্ত্রী পর্ব — রণক্ষেত্রে বিধবাদের বিলাপ ১২. শান্তি পর্ব — শরশয্যা থেকে ভীষ্মের শাসন, ধর্ম ও দর্শনবিষয়ক উপদেশ ১৩. অনুশাসন পর্ব — ধর্ম, দান ও আচরণ বিষয়ে অতিরিক্ত নির্দেশ ১৪. অশ্বমেধিক পর্ব — যুধিষ্ঠিরের অশ্বমেধ যজ্ঞ ১৫. আশ্রমবাসিক পর্ব — ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তীর সন্ন্যাসজীবন ও মৃত্যু ১৬. মৌসল পর্ব — যাদবদের আত্মঘাতী ধ্বংস ১৭. মহাপ্রস্থানিক পর্ব — পাণ্ডবদের শেষ যাত্রা ১৮. স্বর্গারোহণ পর্ব — স্বর্গে আরোহণ
অন্তর্নিহিত আখ্যান: গল্পের মধ্যে গল্প
মহাভারতের সর্বাধিক স্বতন্ত্র সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যগুলির একটি হলো এর বিপুল অন্তর্নিহিত আখ্যানের (উপাখ্যান) ভাণ্ডার — গল্পের মধ্যে গল্প যা মূল কাহিনিকে প্রতিফলিত, আলোকিত ও ভাষ্য করে। বন পর্বেই কয়েক ডজন উপআখ্যান রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান:
-
নল ও দময়ন্তী — প্রেম, বিচ্ছেদ, জুয়ার আসক্তি ও চূড়ান্ত পুনর্মিলনের কাহিনি যা সরাসরি যুধিষ্ঠিরের দ্যূত-অভিজ্ঞতাকে প্রতিফলিত করে। রাজা নল, কলি দৈত্যের দ্বারা আবিষ্ট হয়ে, ছলনাপূর্ণ জুয়ায় রাজ্য হারান এবং নির্বাসনে ভ্রমণ করেন, যখন তাঁর নিবেদিতা পত্নী দময়ন্তী অক্লান্তভাবে তাঁকে খোঁজেন। ২৬টি অধ্যায় ও প্রায় ১,১০০ শ্লোকে বিস্তৃত এই কাহিনি সংস্কৃত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম প্রেমকাহিনিগুলির অন্যতম।
-
সাবিত্রী ও সত্যবান — রাজকন্যা সাবিত্রীর কাহিনি, যিনি জেনেশুনে সত্যবানকে বিয়ে করেন যদিও ভবিষ্যদ্বাণী আছে যে এক বছরের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হবে। যম মৃত্যুদেবতা সত্যবানের প্রাণ নিতে এলে, সাবিত্রী তাঁকে অনুসরণ করেন এবং তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও অবিচল ভক্তির দ্বারা স্বামীর জীবন ফিরিয়ে আনেন — পতিব্রতা ধর্ম ও ভাগ্যের ওপর প্রজ্ঞার জয়ের এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত। বাংলায় সাবিত্রী-সত্যবানের কাহিনি বট-সাবিত্রী ব্রতের মধ্য দিয়ে আজও জীবন্ত রয়েছে, যেখানে বিবাহিত নারীরা বটবৃক্ষের পূজার মাধ্যমে স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
-
ঋষ্যশৃঙ্গের কাহিনি — একজন আশ্রিত ঋষিপুত্র ও জগতের সাথে তার সাক্ষাতের গল্প, যা নিষ্পাপতা, কামনা ও পবিত্র কর্তব্যের অন্বেষণ করে।
নৈতিক বিশ্ব: ধর্ম ও তার ছায়া
বিশ্বের মহাকাব্যগুলির মধ্যে মহাভারত নৈতিক দ্ব্যর্থতার নির্ভীক পরীক্ষায় অনন্য। সরল আখ্যানের বিপরীতে যেখানে ভালো-মন্দ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত, মহাভারত ধর্মকে স্বভাবতই জটিল, পরিস্থিতি-নির্ভর ও প্রায়ই মর্মান্তিকভাবে স্ববিরোধী রূপে উপস্থাপন করে:
- যুধিষ্ঠির, “ধর্মরাজ”, তাঁর গুরু দ্রোণের কাছে মিথ্যা বলেন, যা দ্রোণের মৃত্যু ঘটায় — এবং তাঁর দিব্য রথ, যা সর্বদা ধর্মের চিহ্নস্বরূপ ভূমি থেকে উপরে ভাসত, মাটিতে নেমে আসে।
- অর্জুন, শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা, শিখণ্ডীর আড়ালে তাঁর প্রিয় পিতামহ ভীষ্মকে বধ করেন।
- ভীম গদাযুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করে দুর্যোধনকে হত্যা করেন।
- কর্ণ, ভুল পক্ষে লড়াই করেন, তবু সম্ভবত উভয় সেনার সবচেয়ে উদার ও বীর যোদ্ধা, কিন্তু জীবনভর সঞ্চিত অভিশাপে ধ্বংস হন।
- স্বয়ং কৃষ্ণ, পরমেশ্বর, পাণ্ডবদের বিজয় নিশ্চিত করতে ছলনা ও রণকৌশলগত হস্তক্ষেপ প্রয়োগ করেন।
শান্তি পর্বে শরশয্যা থেকে ভীষ্মের মহান ধর্মোপদেশ — যা আটান্ন দিন ধরে মকরসংক্রান্তির অপেক্ষায় চলে — এই জটিলতার সরাসরি মোকাবিলা করে: রাজধর্ম (রাজাদের কর্তব্য), আপদ্ধর্ম (সংকটকালের ধর্ম), মোক্ষধর্ম (মুক্তির পথ), এবং নিয়ম ও প্রসঙ্গের মধ্যকার সূক্ষ্ম ভারসাম্য যা নৈতিক জীবনকে সংজ্ঞায়িত করে, তার ওপর বিস্তারিত উপদেশ প্রদান করে।
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
ভারতীয় সভ্যতায় মহাভারতের প্রভাব অপরিমেয়:
-
সাহিত্য ও পরিবেশনা: মহাকাব্য প্রায় প্রতিটি ভারতীয় ভাষায় পুনর্কথিত হয়েছে। বাংলায় কাশীরাম দাসের মহাভারত বাঙালি গৃহস্থজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল — “মহাভারতের কথা / অমৃতসমান / কাশীরাম দাস ভণে / শুনে পুণ্যবান” এই বচন বাংলার ঘরে ঘরে প্রচলিত। যক্ষগান, কথকলি, কুটিয়াট্টম, ছায়ানাটক এবং আধুনিক চলচ্চিত্র ও দূরদর্শনে (বি.আর. চোপড়ার ১৯৮৮ সালের ধারাবাহিক ভারতীয় সম্প্রচার ইতিহাসের সর্বাধিক দর্শিত অনুষ্ঠানগুলির একটি) এর কাহিনি মঞ্চায়িত হয়।
-
দর্শন ও নীতিশাস্ত্র: গীতা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং থোরো, এমারসন থেকে গান্ধী (যিনি একে তাঁর “আধ্যাত্মিক অভিধান” বলেছিলেন) ও ওপেনহাইমার (যিনি প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ দেখে বিশ্বরূপ অধ্যায় উদ্ধৃত করেছিলেন) পর্যন্ত চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করেছে।
-
বিধি ও শাসন: শান্তি পর্বের রাজধর্ম বিষয়ক শিক্ষা প্রাচীন সাহিত্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সর্বাধিক বিস্তারিত গ্রন্থগুলির একটি, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের তুল্য।
-
শিল্প ও মূর্তিশিল্প: মহাভারতের দৃশ্যাবলি — দ্যূতক্রীড়া, কৃষ্ণের গীতোপদেশ, ভীষ্মের পতন — কম্বোডিয়ার অ্যাংকর ভাটের মন্দিরভাস্কর্য থেকে জাভার প্রম্বানন পর্যন্ত, সহস্রাব্দ ও সভ্যতা জুড়ে চিত্রিত।
শেষ যাত্রা
মহাকাব্য বিজয়ে শেষ হয় না। মৌসল পর্বে কৃষ্ণের নিজের যাদব কুলের মদ্যপান-জনিত ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে আত্মধ্বংস এবং কৃষ্ণের নিজের মৃত্যু — একজন শিকারির তীরে তাঁর পায়ে, একমাত্র সংবেদনশীল স্থানে — বর্ণিত। মহাপ্রস্থানিক পর্বে পাঁচ পাণ্ডব ও দ্রৌপদী মেরু পর্বতের দিকে শেষ যাত্রায় বের হন, জগৎ ত্যাগ করে। একে একে দ্রৌপদী, সহদেব, নকুল, অর্জুন ও ভীম পথে পতিত হয়ে প্রাণত্যাগ করেন। কেবল যুধিষ্ঠির, একটি বিশ্বস্ত কুকুরের (যে স্বয়ং ধর্মের ছদ্মবেশ) সঙ্গে, স্বর্গদ্বারে পৌঁছান — যেখানে তাঁর একটি শেষ নৈতিক পরীক্ষা হয়: তিনি কুকুর ছাড়া এবং পরিবার ছাড়া স্বর্গে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেন, ঘোষণা করেন যে তিনি ক্ষুদ্রতম সঙ্গীকেও পরিত্যাগ করবেন না।
এই শেষ দৃশ্য মহাভারতের গভীরতম শিক্ষাকে ধারণ করে: ধর্ম কোনো যান্ত্রিকভাবে প্রযোজ্য সূত্র নয়, বরং একটি জীবন্ত অঙ্গীকার যা প্রতিটি মুহূর্তে নতুন করে পরীক্ষিত হয় — সাহস, করুণা এবং ন্যায়ের পক্ষে একা দাঁড়ানোর ইচ্ছাশক্তির দাবি নিয়ে — স্বর্গের দ্বারপ্রান্তেও।