ভূমিকা

যম (সংস্কৃত: যম), যিনি যমরাজ, ধর্মরাজ, কাল, মৃত্যু ও অন্তক নামেও পরিচিত, হিন্দু দেবমণ্ডলের সবচেয়ে প্রাচীন ও তাৎপর্যপূর্ণ দেবতাদের অন্যতম। তিনি মৃত্যুর দেবতা, মৃতদের সার্বভৌম শাসক, এবং সেই দিব্য বিচারক যিনি এই নশ্বর জগৎ থেকে প্রস্থানকারী প্রতিটি আত্মার পুণ্য ও পাপ পরিমাপ করেন। বৈদিক ঐতিহ্যে যমের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে: তিনি ছিলেন প্রথম মর্ত্য প্রাণী যিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং পরলোকের পথ আবিষ্কার করে তার শাশ্বত অধিপতি ও পথপ্রদর্শক হয়েছিলেন (ব্রিটানিকা, “যম”; উইকিপিডিয়া, “যম”)।

যম কেবল ভীতির বিষয় নন — তিনি ধর্মের মূর্তিমান রূপ — সত্য ব্যবস্থা, ব্রহ্মাণ্ডীয় ন্যায়বিচার ও নৈতিক বিধান। তাঁর উপাধি ধর্মরাজ তাঁর কার্যকে প্রতিফলিত করে — কর্মফলের নিরপেক্ষ বিচারক, যিনি সম্পূর্ণ সমতায় পুরস্কার ও শাস্তি প্রদান করেন। কঠোপনিষদে স্বয়ং যমই বালক নচিকেতার কাছে অমরত্বের পরম রহস্য — আত্মার (আত্মন্) জ্ঞান — প্রকাশ করেন, যার ফলে মৃত্যুর দেবতা বিস্ময়করভাবে জীবনের গভীরতম সত্যের মহত্তম শিক্ষক হয়ে ওঠেন।

বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যমের বিশেষ স্থান রয়েছে। বাংলায় যমপুকুর, যমুনা (যমের যমজ বোন) এবং ভাইফোঁটা উৎসব — সবই যমের সাথে সম্পর্কিত। ভাইফোঁটায় বোনেরা ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিয়ে তাঁর দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করেন, যা যম ও যমীর বন্ধনের কিংবদন্তি থেকে উদ্ভূত।

বৈদিক উৎপত্তি

যম ভারতীয় ধর্মীয় সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন স্তরে আবির্ভূত হন। ঋগ্বেদে (১০.১৪) তাঁকে একজন ভয়ঙ্কর শাস্তিদাতা হিসেবে নয়, বরং প্রথম মর্ত্য প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে যিনি পিতৃলোকের পথ খুঁজে পেয়েছিলেন:

যমং হ প্রথমো মৃত্যুমায়ৎ, প্রথমো হ দেবযানাং পন্থামানশে। — “যম ছিলেন প্রথম যাঁর মৃত্যু হয়েছিল; তিনিই প্রথম যিনি দেবযান পথ খুঁজে পেয়েছিলেন।” (ঋগ্বেদ ১০.১৪.১)

এই প্রারম্ভিক বৈদিক ধারণায়, যম একজন কল্যাণময় সত্তা — একজন রাজা যিনি স্বর্গে পূর্বপুরুষদের আনন্দময় সভায় সভাপতিত্ব করেন। তাঁকে একটি সুন্দর বৃক্ষের নীচে বসে, দেবতাদের সাথে সোমপান করতে এবং মৃতদের তাঁর আবাসে স্বাগত জানাতে দেখানো হয়েছে।

প্রসিদ্ধ যম-যমী সূক্ত (ঋগ্বেদ ১০.১০) যম ও তাঁর যমজ বোন যমী (যমুনা)-র মধ্যে সংলাপ উপস্থাপন করে, যেখানে যমী মানব বংশ রক্ষার জন্য মিলনের প্রস্তাব রাখেন। যম তা প্রত্যাখ্যান করে ভাই-বোনের সম্পর্কের নৈতিক সীমারেখা বজায় রাখেন — যাকে পরবর্তী ঐতিহ্য সম্পর্ক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বিষয়ে ধর্মবিধির প্রথম প্রতিষ্ঠা হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

বংশ ও পরিবার

বৈদিক ও পৌরাণিক উভয় উৎস অনুসারে, যম বিবস্বৎ (সূর্যদেব) ও সরণ্যু (সংজ্ঞা) — দিব্য স্থপতি ত্বষ্টার কন্যা — এর পুত্র। তাঁর যমজ বোন যমী, যিনি পরবর্তী পৌরাণিক কাহিনীতে নদীদেবী যমুনা হন। কিছু গ্রন্থে তাঁর সৎভাই হিসেবে মনু (বৈবস্বত মনু) — মানব জাতির প্রবর্তক — ও শনি গ্রহকে চিহ্নিত করা হয়েছে — সবাই সূর্যের সন্তান।

যমের রাজ্য যমলোক বা সংযমনী নামে পরিচিত, যা দক্ষিণ দিকে অবস্থিত — হিন্দু দিক-নির্দেশনায় মৃত্যুর সাথে যুক্ত দিক, যেখানে যম দিক্পাল (দক্ষিণের রক্ষক) হিসেবে কার্য করেন।

প্রতিমাবিদ্যা ও বৈশিষ্ট্য

যমের প্রতিমাবিদ্যা সৌম্য বৈদিক রূপ থেকে ভয়াবহ পৌরাণিক চিত্রণে বিবর্তিত হয়েছে। তাঁর আদর্শ পৌরাণিক রূপে:

  • বর্ণ: শ্যামবর্ণ বা সবুজাভ, ঝড়ের মেঘের মতো
  • বাহু: অধিকাংশ চিত্রণে চতুর্ভুজ
  • বাহন: কালো মহিষ
  • অস্ত্র: পাশ (ফাঁস) যা দিয়ে তিনি মৃত্যুপথযাত্রী প্রাণীদের আত্মা বাঁধেন, এবং দণ্ড (ন্যায়ের গদা)
  • পোশাক: লাল, হলুদ বা নীল বস্ত্র, অগ্নিমালায় সজ্জিত
  • মুখাবয়ব: ক্রোধপূর্ণ, উদ্গত দন্ত ও তীক্ষ্ণ চোখসহ

তাঁর দুটি কুকুর — ঋগ্বেদে (১০.১৪.১০–১২) চতুর্নয়ন, প্রশস্ত নাসিকাবিশিষ্ট, বাদামী দাগযুক্ত (শ্যামা ও শবল নামে) — তাঁর রাজ্যের পথ পাহারা দেয়। কাক ও পায়রা তাঁর দূত।

ধর্মরাজ হিসেবে যম

বেদ যমকে মূলত মৃতদের রাজা হিসেবে উপস্থাপন করলেও, পুরাণ ও মহাকাব্যসমূহ তাঁর ভূমিকাকে ধর্মরাজে — সমস্ত আত্মার বিচারকে — প্রসারিত করেছে। এই ক্ষমতায় যম সংযমনী পুরীতে তাঁর দরবারে আসীন থেকে প্রতিটি মৃত প্রাণীর ভাগ্য নির্ধারণ করেন। তাঁর হিসাবরক্ষক চিত্রগুপ্ত অগ্রসন্ধানী — সেই ব্রহ্মাণ্ডীয় খাতা যেখানে প্রতিটি প্রাণীর প্রতিটি কর্ম লিপিবদ্ধ — রক্ষণাবেক্ষণ করেন।

কোনো আত্মা যমের সিংহাসনের সামনে এলে চিত্রগুপ্ত সেই ব্যক্তির কর্মের হিসাব পাঠ করেন — পুণ্য ও পাপ উভয়ই। এই হিসাবের ভিত্তিতে যম আত্মাকে তিনটি গন্তব্যের একটিতে প্রেরণ করেন:

  1. স্বর্গ — প্রধানত পুণ্যবানদের জন্য
  2. নরক — প্রধানত পাপীদের জন্য, যেখানে বিভিন্ন শাস্তি পুনর্জন্মের আগে আত্মাকে শুদ্ধ করে
  3. পুনর্জন্ম — কর্মফলের ভারসাম্য অনুযায়ী নির্ধারিত রূপে মর্ত্যলোকে প্রত্যাবর্তন

কঠোপনিষদ: যম ও নচিকেতা

যমের সবচেয়ে দার্শনিকভাবে গভীর চিত্রণ কঠোপনিষদে (আনু. ৮ম–৬ষ্ঠ শতক খ্রি.পূ.) পাওয়া যায়। এখানে যম ভয়ংকর মৃত্যুদেবতা নন, বরং সর্বোচ্চ শিক্ষক যিনি আত্মার (আত্মন্) স্বরূপ ও অমরত্বের পরম রহস্য প্রকাশ করেন।

কাহিনী

ঋষি বাজশ্রবস একটি যজ্ঞ করেছিলেন যেখানে তিনি তাঁর সমস্ত সম্পদ দান করেন। তাঁর কিশোর পুত্র নচিকেতা লক্ষ্য করলেন যে পিতা কেবল বৃদ্ধ, বন্ধ্যা ও ত্রুটিপূর্ণ গাভী দান করছেন। নচিকেতা জিজ্ঞাসা করলেন: “পিতা, আপনি আমাকে কাকে দেবেন?” ক্রুদ্ধ হয়ে বাজশ্রবস বললেন: “তোকে আমি যমকে — মৃত্যুকে — দিলাম!”

নচিকেতা পিতার বাক্য অমোঘ মেনে যমের আবাসের দিকে যাত্রা করলেন। কিন্তু যম অনুপস্থিত ছিলেন, এবং বালক তিন দিন-রাত অন্নজলহীন তাঁর দ্বারে অপেক্ষা করলেন। যম ফিরে এসে জানতে পারলেন যে একজন ব্রাহ্মণ অতিথি উপবাসী অবস্থায় অপেক্ষা করেছেন — আতিথ্যের গুরুতর লঙ্ঘন — তাই তিনি প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ নচিকেতাকে তিনটি বর দিলেন।

প্রথম বর: নচিকেতা চাইলেন পিতার ক্রোধ প্রশমিত হোক। যম তা মঞ্জুর করলেন।

দ্বিতীয় বর: নচিকেতা নাচিকেত অগ্নিবিদ্যা শিখতে চাইলেন। যম তাঁকে সেই অনুষ্ঠান শেখালেন।

তৃতীয় বর: নচিকেতা জানতে চাইলেন: “কোনো প্রাণীর মৃত্যু হলে কেউ বলে আত্মা আছে, কেউ বলে নেই। আমাকে এর সত্য জানান।“

যমের উপদেশ

যম অনিচ্ছুক ছিলেন। তিনি নচিকেতাকে অপার ধন-সম্পদ, দীর্ঘায়ু, সুন্দরী নারী, রাজ্য — সবকিছু প্রস্তাব করলেন — এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া। কিন্তু নচিকেতা প্রতিটি প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করলেন:

ন বিত্তেন তর্পণীয়ো মনুষ্যো, লপ্স্যামহে বিত্তমদ্রাক্ষ্ম চেত্ত্বা। জীবিষ্যামো যাবদীশিষ্যসি ত্বং, বরস্তু মে বরণীয়ঃ স এব॥

বালকের দৃঢ়তায় সন্তুষ্ট হয়ে যম সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রকাশ করলেন: আত্মা শাশ্বত, অজন্মা, অমর, সকল পরিবর্তনের অতীত:

ন জায়তে ম্রিয়তে বা বিপশ্চিন্, নায়ং কুতশ্চিন্ন বভূব কশ্চিৎ। অজো নিত্যঃ শাশ্বতোঽয়ং পুরাণো, ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে॥ — “জ্ঞানী আত্মা না জন্মায়, না মরে। সে কোথাও থেকে আসেনি, তা থেকে কিছু জন্মায়নি। সে অজন্মা, শাশ্বত, সনাতন ও পুরাতন। দেহ ধ্বংস হলেও সে ধ্বংস হয় না।” (কঠোপনিষদ ১.২.১৮)

এই শ্লোক, যা পরে ভগবদ্গীতায় (২.২০) প্রতিধ্বনিত, হিন্দু দর্শনের মৌলিক ঘোষণাসমূহের অন্যতম। যে এই শিক্ষা স্বয়ং মৃত্যুদেবতার মুখ থেকে আসে — এটি উপনিষদীয় ঐতিহ্যের মহত্তম বিরোধাভাস ও গভীরতাসমূহের একটি।

মহাকাব্যে যম

মহাভারত

মহাভারতে যম বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন:

  • যুধিষ্ঠিরের পিতা: মহাকাব্যের বংশতালিকায়, যুধিষ্ঠির — জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব ও ধর্মের আদর্শ — রানী কুন্তীর দ্বারা দুর্বাসা ঋষির বরদানে যম (ধর্ম)-কে আহ্বান করে জন্মগ্রহণ করেন। যুধিষ্ঠিরের সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অটল নিষ্ঠা তাঁর দিব্য পিতার উত্তরাধিকার হিসেবে বোঝা হয়।

  • যক্ষ প্রশ্ন: বন পর্বে (অধ্যায় ৩১১–৩১৩), যুধিষ্ঠির এক অভিশপ্ত হ্রদে একজন যক্ষের (যিনি আসলে ছদ্মবেশী যম) মুখোমুখি হন। যক্ষ দার্শনিক ধাঁধার ধারাবাহিক প্রশ্ন করেন। সবচেয়ে বিখ্যাত প্রশ্ন: “জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ বিস্ময় কী?” যুধিষ্ঠির উত্তর দেন: “প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণী মৃত্যুলোকে যায়, তবুও যারা থাকে তারা নিজেদের অমর ভাবে। এর চেয়ে বড় বিস্ময় আর কী হতে পারে?” সন্তুষ্ট হয়ে যম নিজেকে প্রকাশ করেন এবং পতিত ভাইদের জীবন ফিরিয়ে দেন।

  • যুধিষ্ঠিরের অন্তিম যাত্রা: মহাপ্রস্থানিক পর্বস্বর্গারোহণ পর্বে, যখন একমাত্র যুধিষ্ঠির স্বর্গে পৌঁছান যখন তাঁর ভাইরা পথে পতিত হন, তিনি আবার যমের মুখোমুখি হন। যম তাঁকে নরকের দৃশ্য দেখিয়ে পরীক্ষা নেন। যুধিষ্ঠির ভ্রাতৃস্নেহে ভাইদের ছাড়া স্বর্গে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেন। এই চূড়ান্ত পরীক্ষা তাঁর ধর্ম প্রমাণ করে।

সাবিত্রী-সত্যবান কাহিনী

মহাভারতের (বন পর্ব ২৭৭–২৮৩) সবচেয়ে প্রিয় কাহিনীগুলির একটিতে যম কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। অসাধারণ পতিব্রতা রাজকুমারী সাবিত্রী সত্যবানকে বিবাহ করেছিলেন এটা জেনেও যে তাঁর এক বছরের মধ্যে মৃত্যু নির্ধারিত। নির্দিষ্ট দিনে যম সত্যবানের আত্মা নিতে এলে, সাবিত্রী মৃত্যুদেবতাকে অনুসরণ করলেন।

দার্শনিক সংলাপের ধারাবাহিকতায় সাবিত্রীর বাক্চাতুর্য, প্রজ্ঞা ও ভক্তি যমকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে তিনি বারবার বর দিয়েছিলেন — সত্যবানের প্রাণ ব্যতীত। সাবিত্রী বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজের জন্য একশত পুত্র চাইলেন। যেহেতু সত্যবান ছাড়া এটি অসম্ভব, যম তাঁর নিজের কথায় বাধ্য হয়ে সত্যবানকে জীবন ফিরিয়ে দিলেন। বাংলায় সাবিত্রী-সত্যবানের কাহিনী সাবিত্রী ব্রত হিসেবে পালিত হয়, যেখানে বিবাহিত নারীরা স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় উপবাস করেন।

মার্কণ্ডেয় ও যম

আরেকটি প্রসিদ্ধ কাহিনী তরুণ ঋষি মার্কণ্ডেয়ের সাথে জড়িত, যাঁর ষোলো বছর বয়সে মৃত্যু নির্ধারিত ছিল। যমদূতরা তাঁকে নিতে এলে, মার্কণ্ডেয় শিবলিঙ্গ আলিঙ্গন করে শিবের কাছে প্রার্থনা করেন। স্বয়ং যম এসে পাশ নিক্ষেপ করলেন — কিন্তু শিব লিঙ্গ থেকে তাঁর ভয়ংকর কালান্তক রূপে আবির্ভূত হয়ে যমকে লাথি মেরে আঘাত করলেন। তারপর শিব যমকে পুনর্জীবিত করেন এবং মার্কণ্ডেয়কে চিরযৌবন দান করেন।

হিন্দু আচার ও উৎসবে যম

যমের উপস্থিতি হিন্দু আচারিক জীবনে ব্যাপ্ত:

  • যম তর্পণ: পিতৃপক্ষে (পিতৃদের পক্ষকালে), মৃত পূর্বপুরুষদের সম্মানে অনুষ্ঠান পালিত হয় এবং যমকে তাঁদের অধিপতি হিসেবে আহ্বান করা হয়। বাংলায় পিতৃপক্ষ বিশেষভাবে পালিত হয়, বিশেষত মহালয়ার দিন।
  • দীপাবলি: দীপাবলির দ্বিতীয় দিন কিছু পরম্পরায় নরক চতুর্দশী বা যম দ্বিতীয়া হিসেবে পালিত হয়।
  • ভাইফোঁটা (যম দ্বিতীয়া): দীপাবলির দুই দিন পর পালিত এই উৎসব ভাই-বোনের বন্ধনকে সম্মান করে, যম ও তাঁর যমজ বোন যমীর (যমুনা) কিংবদন্তি থেকে উদ্ভূত। বোনেরা ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করেন। বাংলায় ভাইফোঁটা অত্যন্ত জনপ্রিয় উৎসব, বিশেষত কার্তিক মাসে। ঐতিহ্য মতে, যম তাঁর বোন যমীকে এই দিনে দেখতে গিয়েছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন যে এই দিনে যে ভাই বোনের কাছে যাবে তার অকালমৃত্যু হবে না।
  • দিশা-পূজা: দিক্পাল সংক্রান্ত মন্দির অনুষ্ঠানে যম দক্ষিণ দিকের রক্ষক হিসেবে পূজিত হন।

হিন্দু ধর্মের বাইরে যম

যমের প্রভাব হিন্দু ঐতিহ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। বৌদ্ধ পুরাণে তাঁকে নরক-লোকের শাসক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। চীনা বৌদ্ধ ধর্মে তিনি ইয়ানলুওওয়াং (閻羅王), জাপানি বৌদ্ধ ধর্মে এন্মা-ও (閻魔王), এবং তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মে শিনজে, মৃত্যুর অধিপতি ও ধর্মপাল হিসেবে পরিচিত। এই আন্তঃসাংস্কৃতিক প্রচার যমকে এশীয় ধর্মীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত দিব্য সত্তাদের অন্যতম করে তুলেছে।

দার্শনিক তাৎপর্য

হিন্দু চিন্তায় যমের তাৎপর্য পৌরাণিক কাহিনীর পরিধি ছাড়িয়ে যায়:

  1. মৃত্যুর সর্বজনীনতা: যমের পাশ প্রতিটি প্রাণীকে ব্যতিক্রম ছাড়াই ধরে। এটি শূন্যবাদ নয়, বরং আধ্যাত্মিক জরুরিতার আহ্বান — মৃত্যুবোধ মোক্ষ অন্বেষণের প্রেরণা।

  2. কর্মের নিয়ম: ধর্মরাজ হিসেবে, যম কর্মফল ন্যায়ের সাকাররূপ। তাঁর নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করে যে নৈতিক বিশ্ব সুশৃঙ্খল, কর্মের ফল আছে, এবং চূড়ান্তভাবে ধর্মের জয় হয়।

  3. শিক্ষক হিসেবে মৃত্যু: কঠোপনিষদ সেই মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি উপস্থাপন করে যে সর্বোচ্চ জ্ঞান — অমর আত্মার জ্ঞান — ঠিক মৃত্যুদেবতার কাছ থেকেই পাওয়া যায়।

  4. জীবনের যমজ: যমীর (যিনি জীবনদায়িনী নদী যমুনা হন) যমজ ভ্রাতা হিসেবে, যম মৃত্যুকে জীবনের বিপরীত নয়, বরং তার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী — একই বাস্তবতার অপর মুখ — হিসেবে উপস্থাপন করেন।

উপসংহার

যম, মৃত্যু ও ধর্মের দেবতা, হিন্দু ধর্মীয় কল্পনায় গভীর গুরুত্বের আসন অধিকার করেন। ঋগ্বেদের পিতৃলোকের প্রসন্ন রাজা থেকে পুরাণের ভয়ংকর ধর্মরাজ, কঠোপনিষদের করুণাময় শিক্ষক থেকে মহাভারতের কঠোর কিন্তু চূড়ান্তভাবে ন্যায়পরায়ণ দেবতা — যম সেই হিন্দু উপলব্ধির মূর্তরূপ যে মৃত্যু সমাপ্তি নয়, একটি দেহলী — বিচার, রূপান্তর ও সম্ভাব্য মুক্তির মুহূর্ত।

যেমন কঠোপনিষদ স্বয়ং যমের মুখে ঘোষণা করে:

শ্রেয়শ্চ প্রেয়শ্চ মনুষ্যমেতস্, তৌ সম্পরীত্য বিবিনক্তি ধীরঃ। — “শ্রেয় ও প্রিয় দুই-ই মানুষের সামনে আসে। ধীর ব্যক্তি উভয়ের পরীক্ষা করে শ্রেয়কে বেছে নেন।” (কঠোপনিষদ ১.২.২)

যমে হিন্দু ধর্ম মৃত্যুর বাস্তবতার মুখোমুখি হয় — অস্বীকার বা হতাশায় নয়, বরং প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ও সেই চূড়ান্ত মুক্তিদায়ক জ্ঞানের সাথে যে আত্মা মৃত্যুর নাগালের বাইরে।