হনুমান চালীসা (হিন্দিতে हनुमान चालीसा, আক্ষরিক অর্থ — “হনুমানের চল্লিশটি পদ”) হিন্দু ধর্মের সর্বাধিক পঠিত ভক্তিস্তোত্রগুলির অন্যতম। ষোড়শ শতাব্দীর মহাকবি গোস্বামী তুলসীদাস (আনু. ১৫৩২—১৬২৩ খ্রি.) অবধী ভাষায় এই স্তুতি রচনা করেন। চল্লিশটি চৌপাঈতে শ্রীহনুমানের গুণ, পরাক্রম ও দিব্য স্বরূপের বন্দনা করা হয়েছে। প্রতিদিন কোটি কোটি ভক্ত এই চালীসা পাঠ করেন — এটি কেবল একটি স্তুতি নয়, সমগ্র ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তুলসীদাস: কবি ও ভক্ত

গোস্বামী তুলসীদাসের জন্ম উত্তরপ্রদেশের রাজাপুরে (বর্তমান বাঁদা জেলা) আনুমানিক ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে। তিনি শ্রীরামচরিতমানস-এর রচয়িতা, যা উত্তর ভারতের ভক্তি-সংস্কৃতিকে নতুন রূপ দিয়েছিল। তাঁর সমগ্র জীবন শ্রীরাম ও হনুমানের ভক্তিতে নিবেদিত ছিল।

লোকপরম্পরা অনুসারে তুলসীদাস হনুমান চালীসা রচনা করেন এক অত্যন্ত কঠিন সময়ে। একটি প্রচলিত কাহিনি বলে যে মুঘল সম্রাট আকবর (অথবা তাঁর কোনো কর্মচারী) তুলসীদাসকে কারাগারে আটকে রেখেছিলেন। বন্দি অবস্থায় তিনি হনুমানকে আহ্বান করেন এবং চালীসার জন্ম হয়। কথিত আছে যে বানরদের এক বিশাল দল দিল্লিতে হট্টগোল সৃষ্টি করলে সম্রাট তুলসীদাসকে মুক্তি দেন। ঐতিহাসিক বিবরণে ভিন্নতা থাকলেও এই কাহিনি সেই গভীর বিশ্বাসকে ব্যক্ত করে যা চালীসার প্রতিটি পংক্তিতে প্রবাহিত।

তুলসীদাসের যুগ ছিল উত্তর ভারতে ভক্তি আন্দোলন-এর স্বর্ণকাল। কবীর, সূরদাস, মীরাবাঈর মতো সন্ত-কবিরা সংস্কৃতের পরিবর্তে লোকভাষায় ভক্তিসাহিত্য রচনা করছিলেন, যাতে আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। হনুমান চালীসা এই মহৎ ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ।

হনুমান চালীসার গঠন

দুটি প্রারম্ভিক দোহা (দ্বিপদী)

প্রথম দোহা গুরুবন্দনা: তুলসীদাস তাঁর গুরুর চরণকমলের রেণু দিয়ে নিজ মনরূপ দর্পণ পরিষ্কার করেন এবং শ্রীরঘুবরের (শ্রীরামের) নির্মল যশ বর্ণনের সংকল্প নেন। দ্বিতীয় দোহায় তিনি নিজের বুদ্ধিহীনতা স্বীকার করে পবনকুমার হনুমানের কাছে বল, বুদ্ধি ও বিদ্যা প্রার্থনা করেন এবং সমস্ত ক্লেশ ও বিকার দূর করার জন্য নিবেদন করেন।

চল্লিশটি চৌপাঈ

চালীসার মূল অংশ ৪০টি চৌপাঈতে (চার পংক্তির ছন্দে) বিন্যস্ত। এই চৌপাঈগুলি ক্রমানুসারে হনুমানের গুণ, রামায়ণের কাহিনি এবং তাঁর দিব্য শক্তির গান গায়।

একটি সমাপ্তি দোহা (ফলশ্রুতি)

শেষ দোহায় পাঠের ফল ঘোষিত হয়েছে — যিনি শ্রদ্ধাভরে এই পদগুলি পাঠ করেন, তিনি হনুমানের কৃপা লাভ করেন।

প্রধান বিষয়বস্তু ও চৌপাঈর সারাংশ

হনুমানের স্বরূপ বর্ণনা (চৌপাঈ ১—৫)

প্রথম পাঁচটি চৌপাঈতে হনুমানের বিরাট মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁকে “জ্ঞান গুণ সাগর” বলা হয়েছে — জ্ঞান ও গুণের অতল সমুদ্র। তিনি “তিহুঁ লোক উজাগর” — তিন লোককে আলোকিতকারী। “রাম দূত অতুলিত বল ধামা” — শ্রীরামের দূত, যাঁর বলের কোনো তুলনা নেই। “অঞ্জনি-পুত্র পবনসুত” — মাতা অঞ্জনীর সন্তান ও পবনদেবের অংশ। “মহাবীর বিক্রম বজরংগী” — বজ্রের মতো দৃঢ় দেহের মহাবীর, যিনি কুবুদ্ধি দূর করেন ও সুবুদ্ধির সঙ্গী।

রামায়ণের কাহিনি (চৌপাঈ ১১—২৫)

চালীসার কেন্দ্রীয় অংশ হনুমানের অমর পরাক্রমের বর্ণনা:

  • সীতা-অন্বেষণ: হনুমান সমুদ্র পার করে লঙ্কায় গেলেন, সূক্ষ্ম রূপ ধারণ করে অশোক বাটিকায় সীতাদেবীকে দর্শন দিলেন এবং শ্রীরামের আংটি প্রদান করলেন।
  • লঙ্কা দহন: সংবাদ পৌঁছানোর পর হনুমান তাঁর জ্বলন্ত লেজ দিয়ে সমগ্র লঙ্কা দগ্ধ করলেন — রাবণের অধর্মের বিরুদ্ধে দিব্য প্রতিশোধ।
  • সঞ্জীবনী প্রসঙ্গ: লক্ষ্মণ মূর্চ্ছিত হলে হনুমান হিমালয়ে গেলেন এবং নির্দিষ্ট ওষধি চিনতে না পেরে সমগ্র দ্রোণগিরি পর্বত তুলে আনলেন। লক্ষ্মণের জীবন ফিরে পেলে শ্রীরাম হনুমানকে হৃদয়ে আলিঙ্গন করলেন।
  • রামের স্বীকৃতি: শ্রীরাম হনুমানকে তাঁর প্রিয় ভাই ভরতের সমতুল্য ঘোষণা করলেন — “তুম মম প্রিয় ভরতহি সম ভাই” — ভক্তের জন্য সর্বোচ্চ সম্মান।

দিব্য শক্তি ও বরদান (চৌপাঈ ২৬—৩৫)

  • মাতা সীতার বরে হনুমান অষ্ট সিদ্ধি ও নব নিধির অধিকারী (“অষ্ট সিদ্ধি নব নিধি কে দাতা”)।
  • তিনি রাম-রসায়ন (রামভক্তির অমৃত) সর্বদা বহন করেন।
  • যিনি হনুমানের শরণ নেন, তাঁর কোনো ভয় থাকে না।
  • “মহাবীর”-এর নাম শুনলেই ভূত-প্রেত দূরে পলায়ন করে (“ভূত পিশাচ নিকট নহিঁ আবৈ, মহাবীর জব নাম সুনাবৈ”)।

ফলশ্রুতি (চৌপাঈ ৩৬—৪০ ও সমাপ্তি দোহা)

তুলসীদাস ঘোষণা করেন: “যো সত বার পাঠ কর কোই, ছূটহিঁ বন্দি মহা সুখ হোই” — যিনি একশত বার পাঠ করেন, তিনি বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরম সুখ লাভ করেন। সমস্ত কষ্ট বিনষ্ট হয় এবং হনুমান সর্বদা রক্ষা করেন।

পাঠের ঐতিহ্য ও বিধি

দৈনিক পাঠ

কোটি কোটি ভক্ত প্রতিদিন সকালে বা সন্ধ্যায় হনুমানের বিগ্রহ বা চিত্রের সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে চালীসা পাঠ করেন। ভারতের প্রায় প্রতিটি হিন্দু গৃহে এটি নিত্য অনুষ্ঠানের অংশ।

মঙ্গলবার ও শনিবারের বিশেষ পূজা

এই দুটি দিন হনুমানের জন্য বিশেষ পবিত্র। মন্দিরে ভক্তসমাগম হয়, সমবেত পাঠ হয়, সিন্দূর, তেল, ফুল ও লাড্ডুর ভোগ নিবেদিত হয়। এই দিনগুলিতে চালীসা পাঠ বিশেষ ফলদায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়।

সংকটকালে পাঠ

ভয়, রোগ, বিপদ বা যেকোনো কষ্টের সময় হনুমান চালীসা পাঠই প্রথম আশ্রয়। এই বিশ্বাস সর্বব্যাপী যে চালীসা পাঠ কুশক্তি, কুদৃষ্টি ও দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা করে।

বাংলায় হনুমান ভক্তি

বাংলায় হনুমানের পূজা একটি সুদীর্ঘ ঐতিহ্য বহন করে, যদিও এর রূপ উত্তর ভারত থেকে কিছুটা ভিন্ন:

পাঁচমুখী হনুমান

বাংলার অনেক মন্দিরে পঞ্চমুখী হনুমান-এর বিগ্রহ দেখা যায়, যেখানে হনুমানের পাঁচটি মুখ — বানর, সিংহ, গরুড়, বরাহ ও হয়গ্রীব — একত্রে পূজিত হন। এটি তান্ত্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশ্রিত একটি বিশেষ বাঙালি রূপ।

রামায়ণ পাঠের ঐতিহ্য

বাংলায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ (কৃত্তিবাস ওঝা রচিত, পঞ্চদশ শতাব্দী) অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই রামায়ণে হনুমানের পাত্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাঙালি ভক্তরা হনুমানকে মূলত রামায়ণের এই বাংলা সংস্করণের মাধ্যমে চেনেন। অনেক বাঙালি পরিবারে কৃত্তিবাসী রামায়ণের সুন্দরকাণ্ড পাঠের পাশাপাশি হনুমান চালীসাও পড়া হয়।

শনিবারের পূজা

বাংলায় শনিবার হনুমানের দিন হিসেবে বিশেষভাবে পালিত হয়। কলকাতার কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর ও অন্যান্য মন্দির-সংলগ্ন হনুমান মন্দিরে এই দিনে বিশেষ পূজা ও চালীসা পাঠের আয়োজন হয়।

মহাবীর জয়ন্তী

চৈত্র মাসের পূর্ণিমায় হনুমান জয়ন্তী পালিত হয়। বাংলায় এই উৎসবে মন্দিরে বিশেষ পূজা, সুন্দরকাণ্ড পাঠ, হনুমান চালীসা পাঠ ও প্রসাদ বিতরণ হয়।

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

হনুমান চালীসা রামভক্তি পরম্পরার মূল তত্ত্বগুলিকে ধারণ করে:

  1. দাস্যভক্তি: হনুমান নিষ্কাম সেবার সর্বোচ্চ আদর্শ — তাঁর সমগ্র সত্তা শ্রীরামের সেবায় নিবেদিত।
  2. গুরুভক্তি: প্রারম্ভিক দোহায় গুরুবন্দনা ভক্তিপথে গুরুর গুরুত্ব নির্দেশ করে।
  3. কৃপার সুলভতা: চালীসা শেখায় যে সত্যনিষ্ঠ হৃদয়ে হনুমানকে ডাকলে দিব্য কৃপা পাওয়া যায় — কোনো বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন নেই।
  4. ভক্তি থেকে শক্তি: হনুমানের অপার শারীরিক ও অলৌকিক শক্তি নিজে লক্ষ্য নয়, বরং তাঁর অটল রামভক্তির ফল।
  5. নির্ভয়তা: চালীসা বারবার আশ্বাস দেয় যে হনুমানের ভক্তরা মৃত্যু, দুষ্ট শক্তি ও সাংসারিক কষ্ট থেকে মুক্ত হন।

শাস্ত্র-সন্দর্ভ

  • শ্রীরামচরিতমানস, সুন্দরকাণ্ড (হনুমানের লঙ্কা যাত্রা)
  • বাল্মীকি রামায়ণ, সুন্দরকাণ্ড (হনুমানের পরাক্রমের মূল বিবরণ)
  • কৃত্তিবাসী রামায়ণ, লঙ্কাকাণ্ড (বাংলা ভাষায় হনুমানের কীর্তি)
  • হনুমান চালীসা, দোহা ১—২ ও চৌপাঈ ১—৪০

হনুমান চালীসা কেবল একটি প্রার্থনা নয় — এটি ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে এক জীবন্ত সম্পর্ক। এই চল্লিশটি চৌপাঈতে তুলসীদাস হনুমানের চরিত্রের সারাৎসার — বিনয়ের সঙ্গে শক্তি, ভক্তির সঙ্গে পরাক্রম — এমন ভাষায় রূপ দিয়েছেন যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কোটি কোটি হৃদয়ে সান্ত্বনা, সুরক্ষা ও প্রেরণা দিয়ে আসছে।