চামুণ্ডেশ্বরী মন্দির (ಶ್ರೀ ಚಾಮುಂಡೇಶ್ವರಿ ದೇವಾಲಯ) মহীশূরের (মাইসুরু) পূর্বপ্রান্তে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,০৬৩ মিটার (৩,৪৮৯ ফুট) উচ্চতায় চামুণ্ডি পাহাড়ের শীর্ষে সগৌরবে দণ্ডায়মান। এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে এই পবিত্র শৃঙ্গ নিম্নবর্তী শহরের আধ্যাত্মিক প্রহরী হিসেবে কাজ করেছে — মহিষাসুর বধকারিণী দেবীর ভয়ঙ্কর রূপের আবাসস্থল এবং যাঁর নামেই মহীশূরের নামকরণ। পাঁচ শতাব্দীরও বেশি সময় মহীশূর রাজ্য শাসনকারী ওডেয়ার রাজবংশের কুলদেবী (বংশদেবতা) হিসেবে, চামুণ্ডেশ্বরী কেবল মন্দিরের দেবতা নন বরং একটি শহর, একটি রাজবংশ ও একটি সভ্যতার জীবন্ত আত্মা যা দিব্য নারীশক্তির অসুর অত্যাচারের উপর বিজয়কে শ্রদ্ধা জানায়।
মন্দিরটি আদি শঙ্করাচার্য কর্তৃক গণিত ১৮ মহাশক্তিপীঠের অন্যতম, যেখানে দেবী সতীর কেশ (চুল) পতিত হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়।
মহিষাসুরের কিংবদন্তি ও মহীশূরের ব্যুৎপত্তি
চামুণ্ডেশ্বরীর পুরাণকথা দেবী মাহাত্ম্যে (দুর্গা সপ্তশতী বা চণ্ডীপাঠ নামেও পরিচিত), মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১-৯৩ অধ্যায়ে নিহিত। কেন্দ্রীয় পর্ব (অধ্যায় ২-৪) মহিষাসুরের ত্রাসের বর্ণনা করে — মহিষ (মোষ) অসুর, যিনি ব্রহ্মার কাছ থেকে এমন বর লাভ করেছিলেন যে কোনো দেব বা মানব তাঁকে বধ করতে পারবে না। হতাশ দেবতারা তাঁদের দিব্য শক্তি (তেজস্) একত্রিত করেন, এবং এই জ্বলন্ত সমন্বয় থেকে পরমা দেবীর আবির্ভাব ঘটে — আঠারোটি বাহুতে বিভিন্ন দেবতার অস্ত্র ধারণ করে। সিংহে আরোহণ করে, তিনি রূপান্তরকারী দানবের বিরুদ্ধে ভয়ানক যুদ্ধ চালান। শেষ পর্যন্ত দেবী তাঁর ত্রিশূলে মহিষাসুরের বক্ষ বিদ্ধ করেন এবং তরবারিতে তাঁর শিরশ্ছেদ করেন।
স্থানীয় ঐতিহ্য মতে এই মহাজাগতিক যুদ্ধ যে পাহাড়ে ঘটেছিল তার নামই এখন চামুণ্ডি। মহিষাসুর যেখানে বধ হয়েছিলেন সেই স্থানকে মহিষূরু (মহিষের স্থান) বলা হয়, যা বিবর্তিত হয়ে মহীশূর এবং ব্রিটিশদের দ্বারা “মাইসোর” নামে পরিচিত হয়।
চামুণ্ডা নাম: চণ্ড ও মুণ্ডের হন্ত্রী
“চামুণ্ডেশ্বরী” (চামুণ্ডা-ঈশ্বরী) নামটি দেবী মাহাত্ম্যের একটি পৃথক পর্ব থেকে উদ্ভূত। সপ্তম অধ্যায়ে, দেবী অম্বিকার ক্রোধপূর্ণ ভ্রু থেকে কালীর ভয়ানক রূপের আবির্ভাব ঘটে, যিনি অসুর সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেন। তাঁদের ছিন্ন মস্তক অম্বিকাকে উপহার হিসেবে পেশ করে, কালী এই সম্মানসূচক নাম লাভ করেন: “তুমি চণ্ড ও মুণ্ড উভয়কে ধরেছ বলে… তুমি চামুণ্ডা নামে জগতে প্রসিদ্ধ হবে!”
বাঙালি ভক্তদের কাছে এই কাহিনী বিশেষ অনুরণন বহন করে, কারণ চণ্ডীপাঠ বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুশীলনগুলির অন্যতম এবং চামুণ্ডা দেবী মাহাত্ম্যের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলির একজন।
ঐতিহাসিক বিবর্তন
ওডেয়ার রাজবংশ ও প্রাধান্যে উত্থান
১৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ওডেয়ার রাজবংশের প্রতিষ্ঠার সাথে মন্দিরের ইতিহাসে রূপান্তরকারী অধ্যায় শুরু হয়। ওডেয়াররা চামুণ্ডেশ্বরীকে তাঁদের কুলদেবী হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রথম রাজা ওডেয়ার (রাজত্বকাল ১৫৭৮-১৬১৭) ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে বিশাল দশরা উদ্যাপন উদ্বোধন করেন।
সহস্র সোপান ও নন্দী মনোলিথ
১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে, দোদ্দ দেবরাজ ওডেয়ার পাহাড়ের পাদদেশ থেকে শীর্ষ পর্যন্ত ১,০০৮টি পাষাণ সোপান নির্মাণের আদেশ দেন। আরোহণের প্রায় মধ্যপথে, ৭০০তম সোপানের কাছে, কর্ণাটকের সবচেয়ে বিখ্যাত ভাস্কর্যগুলির একটি দাঁড়িয়ে আছে: একটি বিশাল নন্দী (শিবের পবিত্র বৃষ ও বাহন) একটি কৃষ্ণ গ্রানাইট খণ্ড থেকে খোদিত। এই মনোলিথটি আনুমানিক ৪.৯ মিটার (১৬ ফুট) উচ্চ এবং ৭.৬ মিটার (২৫ ফুট) দীর্ঘ।
কৃষ্ণরাজ ওডেয়ার তৃতীয় ও মহান গোপুরম
মহারাজা কৃষ্ণরাজ ওডেয়ার তৃতীয় (রাজত্বকাল ১৭৯৯-১৮৬৮) ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে ধ্রুপদী দ্রাবিড় শৈলীতে জমকালো সাত তলা গোপুরম নির্মাণের আদেশ দেন, যা মন্দির প্রবেশদ্বারের উপরে আনুমানিক ৪০ মিটার উত্থিত। সাতটি সোনালি কলসে মুকুটযুক্ত এই গোপুরম মহীশূর সমতল জুড়ে দূর থেকে দৃশ্যমান।
মহীশূর দশরা: ভারতের সবচেয়ে জমকালো রাজকীয় উৎসব
মহীশূর দশরা নবরাত্রির (দেবীর নয় রাত্রি) সাথে মিলিত দশদিনের উৎসব যা বিজয়াদশমীতে (বিজয়ের দশম দিন) পরিসমাপ্তি হয়। এটি কর্ণাটকের নাডহব্বা (রাজ্য উৎসব)।
নবরাত্রির নয় রাত্রি
নবরাত্রিতে দেবীকে নয় রাত্রিতে তাঁর নয়টি রূপে পূজা করা হয়। চামুণ্ডেশ্বরী মন্দিরে প্রতিদিন বিশেষ পূজা, অভিষেক ও অলংকার অনুষ্ঠিত হয়। মহীশূর প্রাসাদ প্রায় ১,০০,০০০ আলোকবাতিতে আলোকিত হয়।
জম্বু সওয়ারি: সোনার হাওদা শোভাযাত্রা
দশরা উদ্যাপনের চরম মুহূর্ত হলো বিজয়াদশমীতে জম্বু সওয়ারি, যেখানে দেবী চামুণ্ডেশ্বরীর মূর্তি একটি জমকালোভাবে সজ্জিত হাতির পিঠে আরোহিত সোনার মণ্ডপে (মন্তপ) স্থাপিত হয়। সোনার অম্বারি (হাওদা) আনুমানিক ৭৫০ কিলোগ্রাম ওজনের। শোভাযাত্রা মহীশূর প্রাসাদ থেকে শুরু হয়ে বন্নি মন্তপ মাঠ পর্যন্ত যায়, যেখানে ঐতিহ্যবাহী বন্নি বৃক্ষ পূজা অনুষ্ঠিত হয় — পাণ্ডব রাজপুত্র অর্জুনের ছদ্মবেশের বছর পরে শমী (বন্নি) বৃক্ষ থেকে অস্ত্র পুনরুদ্ধারের স্মরণে।
বাঙালি দৃষ্টিকোণে চামুণ্ডেশ্বরী
বাঙালি হিন্দুদের কাছে চামুণ্ডেশ্বরী মন্দির বিশেষ আকর্ষণ বহন করে, কারণ দেবী মাহাত্ম্য বা চণ্ডীপাঠ বাঙালি ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার রূপ — যা চামুণ্ডি পাহাড়ে পূজিত হয় — সেই একই রূপ যা প্রতি শরৎকালে বাংলায় দুর্গা পূজায় সমারোহে পূজিত হয়। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে “যা দেবী সর্বভূতেষু” মন্ত্রপাঠের সময় বাঙালিরা যে দেবীকে আহ্বান করেন, তিনিই চামুণ্ডি পাহাড়ে সহস্রাব্দ ধরে পূজিত হচ্ছেন।
মহীশূর দশরা এবং বাংলার দুর্গা পূজা — উভয়ই নবরাত্রি থেকে বিজয়াদশমী পর্যন্ত একই দশ দিনে পালিত — দিব্য নারীশক্তির অসুরের উপর বিজয়ের একই মৌলিক আখ্যান উদ্যাপন করে, যদিও দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঞ্চলিক ঐতিহ্যে।
তীর্থযাত্রার তাৎপর্য আজ
চামুণ্ডেশ্বরী মন্দির বার্ষিক আনুমানিক দুই থেকে তিন মিলিয়ন দর্শনার্থী গ্রহণ করে। তীর্থযাত্রীর কাছে, চামুণ্ডি পাহাড়ের যাত্রা পবিত্র ইতিহাসের বহু স্তরের সাক্ষাৎকার: মহিষাসুরের উপর দেবীর বিজয়ের আদি পুরাণকথা, শক্তিপীঠের পৌরাণিক পবিত্রতা, ওডেয়ার রাজাদের মধ্যযুগীয় ভক্তি, এবং জীবন্ত উৎসব ঐতিহ্য যা দেবীকে প্রতি বছর মহীশূরের রাস্তায় ও গৃহে উপস্থিত করে। প্রাচীন সোপান বেয়ে ওঠা হোক, বিশাল নন্দীর সামনে ভক্তির স্থিরতা চিন্তন করা হোক, বা বিজয়াদশমীর সন্ধ্যায় আলোকিত রাস্তায় সোনার হাওদা ভাসতে দেখা হোক — চামুণ্ডি পাহাড়ের অভিজ্ঞতা শাক্ত বিশ্বাসের স্থায়ী শক্তিতে একটি নিমজ্জন — এই প্রত্যয় যে দিব্য মাতা, ভয়ঙ্কর ও করুণাময়, পবিত্র উচ্চতা থেকে তাঁর সন্তানদের রক্ষা করেন।