মহারাষ্ট্রের চরণান্দ্রী পাহাড়ে একটি উঁচু ব্যাসল্ট শিলাস্তরের গা বেয়ে দুই কিলোমিটারেরও বেশি জুড়ে বিস্তৃত ইলোরা গুহাসমূহ (Ellora Caves) প্রাচীন বিশ্বের সর্বাধিক অসাধারণ শৈল্পিক কীর্তিগুলির অন্যতম। আওরাঙ্গাবাদ (বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে ছত্রপতি সম্ভাজীনগর) শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই সমষ্টিতে ৩৪টি শৈলকর্তিত গুহা রয়েছে, যেগুলি ষষ্ঠ থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে খোদাই করা হয়েছে। এতে মঠ, প্রার্থনা কক্ষ ও মন্দির অন্তর্ভুক্ত — ভারতের তিনটি মহান ধর্মীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে: বৌদ্ধ, হিন্দু এবং জৈন

১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো ইলোরাকে তার বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, একে “এক অনন্য শৈল্পিক সৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত কীর্তি” এবং “প্রাচীন ভারতের সহনশীলতার মনোভাবের প্রতীক” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পাঁচ শতাব্দীব্যাপী অবিচ্ছিন্ন স্মারক-ধারা ধ্রুপদী ও প্রাক-মধ্যযুগীয় ভারতীয় সভ্যতাকে জীবন্ত করে তোলে।

ভূগোল ও পরিবেশ

ইলোরা ভারতের পশ্চিম উপকূলের বন্দর নগরগুলিকে দাক্ষিণাত্যের অভ্যন্তরে সংযুক্তকারী প্রাচীন বাণিজ্য পথে অবস্থিত — যা ব্যাখ্যা করে কেন পরপর একাধিক শাসক রাজবংশ এখানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। গুহাগুলি আগ্নেয়গিরিজাত দাক্ষিণাত্য ট্র্যাপ ব্যাসল্ট থেকে কাটা হয়েছে — একটি ঘন, মিহি-দানাযুক্ত শিলা যা সূক্ষ্ম ভাস্কর্যকর্মের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। শিলাস্তরটি মোটামুটি উত্তর-দক্ষিণমুখী এবং গুহাগুলি পশ্চিমমুখী — যাতে অপরাহ্ণের সূর্যালোক অনেক গুহার অভ্যন্তর আলোকিত করে, যা নিঃসন্দেহে সুপরিকল্পিত ছিল।

গুহার তিনটি গোষ্ঠী

চরণান্দ্রী খাড়া পাড়ে একশটিরও বেশি গুহা থাকলেও ৩৪টি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ও ক্রমসংখ্যায়িত। এগুলি তিনটি দলে বিভক্ত।

বৌদ্ধ গুহা (গুহা ১-১২): পঞ্চম-অষ্টম শতাব্দী

ইলোরায় খোদাইয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে বারোটি বৌদ্ধ গুহা নির্মিত হয়, যা আনুমানিক পঞ্চম থেকে অষ্টম শতাব্দীর। এগুলি তৎকালে দাক্ষিণাত্যে প্রচলিত মহাযান বৌদ্ধ দর্শন প্রতিফলিত করে।

অধিকাংশ বৌদ্ধ গুহা বিহার (মঠ) — বহুতল কাঠামো যাতে কেন্দ্রীয় কক্ষের চারপাশে ভিক্ষুদের আবাসকোষ্ঠ সজ্জিত। উল্লেখযোগ্য বৌদ্ধ গুহাগুলির মধ্যে:

  • গুহা ৫ (“মহারওয়াড়া”): ইলোরার বৃহত্তম বিহারগুলির একটি, প্রায় ৩৬ x ১৭ মিটার, দশটি করে দুই সারি স্তম্ভ এবং দীর্ঘ প্রস্তর বেঞ্চসহ — সম্ভবত সাম্প্রদায়িক আহার বা অধ্যয়নের জন্য।
  • গুহা ১০ (“বিশ্বকর্মা” বা “সূত্রধরের গুহা”): বৌদ্ধ দলের একমাত্র চৈত্যগৃহ (প্রার্থনা কক্ষ), খিলানযুক্ত ছাদে কাঠের কড়ির অনুকরণে খোদাই। পশ্চাৎভাগে ৩ মিটারের বেশি উঁচু উপবিষ্ট বুদ্ধ মূর্তি।
  • গুহা ১২ (“তিন তাল”): তিন তলা বিশাল মঠ, ইলোরার সবচেয়ে বিস্তৃত বৌদ্ধ কাঠামো। সর্বোচ্চ তলায় বিভিন্ন মুদ্রায় বুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব পদ্মপাণি ও বজ্রপাণি, এবং দেবী তারার প্রাথমিক প্রতিমা।

বাংলার সাথে এই বৌদ্ধ গুহাগুলির একটি বিশেষ যোগসূত্র রয়েছে — মহাযান বৌদ্ধধর্মের যে ধারা এখানে প্রতিফলিত, সেই একই ধারা বাংলায় পাল রাজবংশের (অষ্টম-দ্বাদশ শতাব্দী) পৃষ্ঠপোষকতায় নালন্দা, বিক্রমশীলা ও পাহাড়পুরে বিকশিত হয়েছিল। বিশেষত দেবী তারার মূর্তি বাঙালি বৌদ্ধ-তান্ত্রিক ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

হিন্দু গুহা (গুহা ১৩-২৯): ষষ্ঠ-দশম শতাব্দী

হিন্দু দল ইলোরার বৃহত্তম ও শৈল্পিকভাবে সর্বাধিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী অংশ — সতেরোটি গুহায় সজ্জিত। ছোট সাদাসিধে মন্দির থেকে শুরু করে বিশাল কৈলাস মন্দির (গুহা ১৬) পর্যন্ত এখানে রয়েছে।

গুহা ২১ (“রামেশ্বর”): ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত সর্বপ্রাচীন হিন্দু গুহা, কলচুরি রাজবংশকে দায়ী করা হয়। প্রবেশদ্বারে নদী দেবী গঙ্গাযমুনার অনুপম মূর্তি; অভ্যন্তরে শিব-নৃত্য ও দুর্গা কর্তৃক মহিষাসুরবধের প্যানেল।

গুহা ২৯ (“ধূমার লেণা”): বৃহত্তম প্রাথমিক গুহাগুলির একটি, এলিফ্যান্টা গুহার সাথে স্থাপত্যসাদৃশ্য বহন করে। বর্ষাকালে একটি প্রাকৃতিক জলপ্রপাত গুহার উপর দিয়ে বয়ে যায় — “যেন মহান শিবের ললাটে গঙ্গা পতিত হচ্ছেন।” এতে শিব কর্তৃক অন্ধকাসুরবধ ও শিব-পার্বতী বিবাহের শক্তিশালী ভাস্কর্য রয়েছে।

গুহা ১৫ (“দশাবতার”): দ্বিতল মন্দির, যেখানে বিষ্ণুর দশ অবতারের বিশাল ভাস্কর্য প্যানেল — বিশেষত বরাহ অবতারের বিখ্যাত দৃশ্য যেখানে ভূদেবীকে আদি সাগর থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। এই গুহাতেই ইলোরার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন শিলালিপি — রাষ্ট্রকূট শাসক দন্তিদুর্গের (আনু. ৭৩০-৭৫৫ খ্রি.) পরিদর্শনের নথি।

জৈন গুহা (গুহা ৩০-৩৪): নবম-দ্বাদশ শতাব্দী

প্রান্তসীমার উত্তর প্রান্তে পাঁচটি জৈন গুহা ইলোরার শেষ নির্মাণ পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। হিন্দু গুহাগুলির তুলনায় ক্ষুদ্রতর হলেও, এগুলি নিখুঁত সূক্ষ্ম খোদাই ও সংযত সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।

  • গুহা ৩২ (“ইন্দ্র সভা”): ইলোরার সর্বশ্রেষ্ঠ ও বৃহত্তম জৈন গুহা। কেন্দ্রে সর্বতোভদ্র মন্দির যেখানে চার তীর্থঙ্কর চার মূল দিকে অধিষ্ঠিত — ঋষভনাথ (প্রথম), নেমিনাথ (দ্বাবিংশ), পার্শ্বনাথ (ত্রয়োবিংশ) ও মহাবীর (চতুর্বিংশ)।
  • গুহা ৩৩ (“জগন্নাথ সভা”): দ্বিতীয় বৃহত্তম জৈন গুহা, নবম শতাব্দীর, সপ্তফণা সর্প-ছত্রসহ পার্শ্বনাথ এবং কায়োৎসর্গ ভঙ্গিতে বাহুবলী (গোমতেশ্বর) চিত্রিত।

কৈলাস মন্দির (গুহা ১৬): পর্বত থেকে খোদিত এক পর্বত

কৈলাস মন্দির (কৈলাসনাথ) ইলোরার সর্বোচ্চ অর্জন এবং নিঃসন্দেহে সমগ্র ভারতের সর্বাধিক বিস্ময়কর স্থাপত্যকর্ম। ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত, এটি কৈলাস পর্বতের — শিবের পৌরাণিক হিমালয়ান আবাসের — ভৌত প্রতিরূপ হিসেবে কল্পিত। বিশ্ব স্থাপত্যের ইতিহাসে এর অনন্যতা হলো এটি সম্পূর্ণরূপে একক শিলা (monolithic) থেকে কাটা — ভিত্তি থেকে ঊর্ধ্বমুখে গড়া হয়নি, বরং ব্যাসল্ট শিলাস্তরের শীর্ষ থেকে নীচের দিকে খোদাই করা হয়েছে।

মাত্রা ও পরিসর

মন্দির চত্বরটি প্রায় ৫০ মিটার দীর্ঘ, ৩৩ মিটার প্রশস্ত ও ৩০ মিটার উচ্চ (১৬৪ x ১০৮ x ১০০ ফুট) — এথেন্সের পার্থেননের প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের। পণ্ডিতদের অনুমান, এর নির্মাণে ১,৫০,০০০ থেকে ২,০০,০০০ টন শিলা উৎখনন করা হয়েছিল — প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ ঘনফুট কঠিন ব্যাসল্ট।

ঊর্ধ্ব-থেকে-নিম্ন উৎখনন কৌশল

কৈলাস মন্দিরের স্থপতিরা একটি বিপ্লবী নির্মাণ পদ্ধতি অবলম্বন করেন। প্রথমে শিলাচূড়ায় তিনটি বিশাল খাত কাটা হয় — দুটি সমান্তরাল খাত (প্রতিটি প্রায় ৯০ মিটার দীর্ঘ) ও একটি সংযোজক খাত (৫৩ মিটার) — যাতে একটি বিপুল আয়তাকার “শিলাদ্বীপ” পৃথক হয়। এরপর ভাস্কররা ওপর থেকে নীচে, স্তরে স্তরে পাথর অপসারণ করে মন্দির খোদাই করেন।

ইতিহাসবিদ এম.কে. ঢবলিকরের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রতি শ্রমিক প্রায় ৪ ঘনফুট শিলা কাটার হারে ২৫০ জন শিল্পী এই কাজ আনুমানিক সাড়ে পাঁচ বছরে সম্পন্ন করতে পারতেন।

স্থাপত্য বিন্যাস

কৈলাস মন্দির চত্বরের সমস্তকিছু একটিমাত্র শিলাখণ্ড থেকে কাটা:

  1. গোপুর (প্রবেশদ্বার): দ্বিতল প্রবেশ-তোরণ
  2. নন্দী মণ্ডপ: শিবের বাহন নন্দীর একক-শিলা মূর্তিসম্বলিত স্বতন্ত্র মণ্ডপ
  3. প্রধান মন্দির: তিনতলা কাঠামো, দ্রাবিড় রীতির অষ্টকোণী শিখর শোভিত
  4. মণ্ডপ (সভা কক্ষ): ষোলটি স্তম্ভসহ কক্ষ, অলঙ্কৃত ছাদ-প্যানেল
  5. গর্ভগৃহ: শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত
  6. দুটি ধ্বজস্তম্ভ: নন্দী মণ্ডপের দুই পাশে স্বতন্ত্র একক-শিলা স্তম্ভ
  7. প্রাণসম হাতি ও সিংহ: ভিত্তিতে খোদিত, যেন সমগ্র কাঠামোকে ধারণ করছে

প্রধান ভাস্কর্যকর্ম

  • রাবণ কৈলাস পর্বত কম্পিত করছেন: ইলোরার সর্বাধিক বিখ্যাত ভাস্কর্যপ্যানেল। দক্ষিণ অধিষ্ঠানে দশমুণ্ড রাক্ষসরাজ রাবণ কৈলাস পর্বতের নীচে আবদ্ধ, ভিত থেকে পর্বত নাড়াতে চেষ্টা করছেন। ওপরে শিব শান্তভাবে পদ চেপে কম্পন থামাচ্ছেন, পার্বতী ভীত হয়ে তাঁকে আঁকড়ে ধরেছেন। এই প্যানেলটি মন্দিরের ঠিক নীচে স্থাপিত — দর্শক যে “কৈলাস পর্বত” রাবণ উৎপাটনের চেষ্টা করছেন, তা ওপরে দেখতে পান।

  • নটরাজ — শিব মহাজাগতিক নর্তক রূপে: অভ্যন্তরীণ দেয়ালে শিবের তাণ্ডব নৃত্য — সৃষ্টি ও প্রলয়ের ব্রহ্মাণ্ডীয় নৃত্য — সংগীতকার ও দিব্য পরিচারকদের মাঝে।

  • রামায়ণ ও মহাভারত প্যানেল: ভিত্তিফলকে ধারাবাহিক ভাস্কর্য পট্টিকায় উভয় মহাকাব্যের কাহিনি — সীতাহরণ, রাম-রাবণ যুদ্ধ, পাণ্ডবদের পাশাখেলা, ভগবদ্গীতার দৃশ্য।

  • গজলক্ষ্মী: প্রবেশদ্বারের নিকটে হস্তীদ্বারা অভিষিক্ত দেবী লক্ষ্মী।

পৃষ্ঠপোষক রাজবংশ

কলচুরি বংশ (ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দী)

প্রাথমিক হিন্দু গুহাগুলি — গুহা ২১ (রামেশ্বর) ও গুহা ২৯ (ধূমার লেণা) — কলচুরি শাসকদের কীর্তি। এদের শৈল্পিক রীতি এলিফ্যান্টা গুহা ও গুপ্তযুগীয় ভাস্কর্য ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত।

রাষ্ট্রকূট বংশ (অষ্টম-দশম শতাব্দী)

রাষ্ট্রকূটরা ইলোরার সর্বাধিক উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। দন্তিদুর্গ আনুমানিক ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে চালুক্যদের পরাজিত করার পর ইলোরা রাজবংশের মর্যাদা-প্রকল্পে পরিণত হয়। দন্তিদুর্গের উত্তরাধিকারী ও কাকা কৃষ্ণ প্রথম (রাজত্ব আনু. ৭৫৬-৭৭৩ খ্রি.) কৈলাস মন্দির নির্মাণের আদেশ দেন — এমন একটি স্মারক যা পরিচিত বিশ্বের যেকোনো মন্দিরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং রাষ্ট্রকূট চক্রবর্তিত্বের (সার্বভৌম সম্প্রভুত্ব) দাবি প্রমাণ করবে।

যাদব বংশ (দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দী)

জৈন গুহাগুলির শেষ পর্যায় যাদব (সেউণ) বংশের সাথে, বিশেষত সিংহণের (রাজত্ব আনু. ১২০০-১২৪৭ খ্রি.) সাথে সম্পৃক্ত। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে দিল্লি সুলতানাতের অধীনে আসার আগ পর্যন্ত জৈন উপাসকরা এই গুহাগুলি ব্যবহার করতেন।

ধর্মীয় সম্প্রীতি: এক শিলাস্তর, তিন ধর্ম

ইলোরার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এটি যা প্রকাশ করে ষষ্ঠ-দ্বাদশ শতাব্দীর ভারতীয় সভ্যতার চরিত্র সম্পর্কে। এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষু, শৈব-বৈষ্ণব পুরোহিত এবং জৈন সন্ন্যাসীরা পাশাপাশি বাস করতেন, পূজা করতেন এবং শিল্প সৃষ্টি করতেন — কখনো কখনো আক্ষরিক অর্থেই শিলাস্তরের একই অংশ ভাগ করে নিয়ে। তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিকৃতি বা শত্রুতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং শৈল্পিক রীতিগুলি পারস্পরিক প্রভাব ও আদানপ্রদান প্রদর্শন করে।

বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্যেও এই সহিষ্ণুতার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় — চৈতন্য মহাপ্রভুর বৈষ্ণব আন্দোলন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “যেথায় থাকে সবার অধম দরিদ্রতম” পর্যন্ত, বাঙালি চিন্তায় সকল ধর্মের সম-মর্যাদার ধারণা গভীরভাবে প্রোথিত। ইলোরা প্রমাণ করে যে ভারতীয় সভ্যতা বহু আগেই অনেকান্তবাদ (বহুপক্ষীয়তা) ও ইষ্টদেবতার ধারণা আত্মস্থ করেছিল।

ইউনেস্কো উদ্ধৃতি যেমন বলে, ইলোরা “প্রাচীন ভারতের সহনশীলতার সেই মনোভাবকে চিত্রিত করে” — একটি বার্তা যা আধুনিক বিশ্বে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

সংরক্ষণ ও পর্যটন

ইলোরা গুহাসমূহ ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI) অধীনে কেন্দ্রীয় সুরক্ষিত স্মারক। প্রধান সংরক্ষণ চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে রয়েছে ব্যাসল্টে জলপ্রবেশ (যা ভাস্কর্যে ছত্রাক ও লবণ জমায়), নিকটবর্তী খনি ও যানবাহন থেকে কম্পন, এবং গণপর্যটনের চাপ।

ASI একাধিক সংরক্ষণ অভিযান পরিচালনা করেছে — ভাস্কর্যের রাসায়নিক পরিষ্কার, বৃষ্টির জল গুহা থেকে দূরে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, এবং শিলাপতন রোধে সুরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ। স্থানটিতে বার্ষিক প্রায় ত্রিশ লক্ষ দর্শনার্থী আসেন।

ইলোরা দেখার সর্বোত্তম সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। গুহাগুলি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খোলা থাকে, এবং কৈলাস মন্দির বিশেষত অপরাহ্ণে অত্যন্ত মনোরম — যখন পশ্চিমী সূর্য এর ভাস্কর্যময় মুখগুলিকে সোনালি আভায় স্নাত করে।

আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার

ইলোরা নিছক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়। লক্ষ লক্ষ হিন্দুর কাছে এটি আজও জীবন্ত পূজাস্থল — বিশেষত কৈলাস মন্দির, যেখানে গর্ভগৃহে শিবের পূজা আজও অনুষ্ঠিত হয়। বৌদ্ধদের কাছে বিহারগুলি সেই যুগের স্মৃতিচিহ্ন যখন মহাযান মঠবাদ ভারতের হৃদয়ে পল্লবিত হচ্ছিল। জৈনদের কাছে ইন্দ্র সভা ও জগন্নাথ সভা দাক্ষিণাত্যে দিগম্বর ঐতিহ্যের গভীর শিকড়ের স্মারক।

বাঙালি দর্শনার্থীদের জন্য ইলোরার একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো এর বৌদ্ধ গুহাগুলিতে দেবী তারার প্রতিমা — যে তারাপূজা আজও তারাপীঠে বাঙালি শক্তি-উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু। ইলোরায় তারার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্যের শিকড় সুদূর দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত বিস্তৃত।

সকল দর্শনার্থীর জন্য, যেকোনো বিশ্বাসেরই হোন না কেন, ইলোরা ধর্মের ঊর্ধ্বে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে: কেমন সভ্যতা এই বিপুল পরিসরের শিল্পকর্ম রচনা করে — সাম্রাজ্যিক বলপ্রয়োগে নয়, আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষায়? উত্তর নিহিত আছে প্রস্তরের মধ্যেই, যেখানে অজ্ঞাতনামা ভাস্করদের ছেনির দাগ, শতাব্দীব্যাপী এক একটি আঘাত হানতে হানতে, একটি ব্যাসল্ট শিলাস্তরকে প্রস্তরে রচিত ভজনে রূপান্তরিত করেছে।