ভূমিকা: যেখানে প্রস্তর আত্মায় রূপান্তরিত হয়

মধ্য ভারতের বুন্দেলখণ্ডের সমতলে, মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর জেলা থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে, মানবজাতির প্রস্তরশিল্পের সবচেয়ে অসাধারণ কীর্তিগুলির একটি দাঁড়িয়ে আছে — খাজুরাহো স্মারকসমূহ। আনুমানিক ৮৮৫ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে চান্দেল রাজপুত রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই মন্দিরগুলি নাগর রীতির হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের পরম শীর্ষবিন্দু। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো স্থানটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

মূল ৮৫টি মন্দিরের মধ্যে আজ প্রায় ২৫টি টিকে আছে, ছয় বর্গকিলোমিটারে তিনটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীতে — পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ — বিস্তৃত। যা অবশিষ্ট আছে তা অলৌকিকের কম নয়: হিমালয়ের শৃঙ্গ অনুকরণকারী সুউচ্চ বেলেপাথরের গোপুর, দেবদেবী, স্বর্গীয় সত্তা, যোদ্ধা, সংগীতজ্ঞ ও প্রেমিকযুগলের প্রায় সহস্র ভাস্কর্যে জীবন্ত দেয়াল। বিখ্যাত কামভাস্কর্য মোট চিত্রকর্মের দশ শতাংশেরও কম, তবু এগুলি এমন এক সভ্যতার প্রতীক হয়ে উঠেছে যা কামনা ও পবিত্রতার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য দেখেনি — যে সভ্যতা কামকে (কামনা) ধর্ম, অর্থ ও মোক্ষের পাশাপাশি জীবনের চারটি বৈধ লক্ষ্যের (পুরুষার্থ) একটি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

চান্দেল রাজবংশ: দিব্যতার নির্মাতা

চান্দেল রাজবংশ (আনু. ৮৩১-১৩১৫ খ্রিষ্টাব্দ) চন্দ্রবংশের ঐতিহ্য দাবি করত। মন্দির-নির্মাণের স্বর্ণযুগ প্রায় দেড় শতাব্দী ব্যাপী: যশোবর্মন (আনু. ৯২৫-৯৫০) লক্ষ্মণ মন্দির নির্মাণ করেন; ধঙ্গ (আনু. ৯৫০-১০০২) বিশ্বনাথ ও পার্শ্বনাথ মন্দির; বিদ্যাধর (আনু. ১০০৩-১০৩৫) কন্দরিয়া মহাদেব মন্দির — খাজুরাহোর সবচেয়ে বৃহৎ, সুউচ্চ ও সমৃদ্ধভাবে ভাস্কর্যময় মন্দির।

তিনটি মন্দির গোষ্ঠী

পশ্চিম গোষ্ঠী

কন্দরিয়া মহাদেব মন্দির (আনু. ১০২৫-১০৫০): খাজুরাহোর মুকুটমণি। শিবকে উৎসর্গীকৃত, ৩১ মিটার (১০২ ফুট) উচ্চতায় উত্থিত। বাইরে ও ভেতরে ৮৭০টিরও বেশি বৃহৎ ভাস্কর্য। শিখরটি ৮৪টি ক্ষুদ্র উপশিখর নিয়ে গঠিত, মেরু পর্বতের প্রস্তর অনুবাদ।

লক্ষ্মণ মন্দির (আনু. ৯৩০-৯৫০): বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠ রূপে নিবেদিত, সম্পূর্ণ পঞ্চায়তন পরিকল্পনার প্রাচীনতম টিকে থাকা নিদর্শন।

বিশ্বনাথ মন্দির (আনু. ১০০২): শিবকে “বিশ্বের নাথ” রূপে নিবেদিত।

চিত্রগুপ্ত মন্দির: সূর্যদেবকে নিবেদিত একমাত্র মন্দির। ২.১ মিটার উচ্চ সূর্যমূর্তি সপ্তাশ্ববাহিত রথে।

পূর্ব গোষ্ঠী

হিন্দু ও জৈন মন্দিরের সংমিশ্রণ। পার্শ্বনাথ মন্দির (আনু. ৯৫০-৯৭০) জৈন মন্দিরগুলির বৃহত্তম, যেখানে হিন্দু বৈষ্ণব চিত্রকর্মও রয়েছে — চান্দেল সমাজের ধর্মীয় বহুত্ববাদের প্রমাণ। একটি ৪x৪ যাদুবর্গও রয়েছে যেখানে প্রতিটি সারি, কলাম ও কর্ণের যোগফল ৩৪।

দক্ষিণ গোষ্ঠী

দুলাদেও মন্দির (আনু. ১১০০-১১৫০): শিবকে নিবেদিত, খাজুরাহোর সর্বশেষ প্রধান মন্দির। চতুর্ভুজ মন্দির: ২.৭ মিটার উচ্চ চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তিসহ।

ভাস্কর্য: প্রস্তরে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড

কামভাস্কর্যের দর্শন

কামভাস্কর্য — মিথুন (প্রেমিকযুগল) চিত্রকর্ম — মন্দিরের বাইরের দেয়ালের সংযোগস্থলে কেন্দ্রীভূত, কখনো গর্ভগৃহে নয়।

তান্ত্রিক ব্যাখ্যা: শিব-শক্তির মিলন — পুরুষ ও নারী মহাজাগতিক নীতির মৌলিক সৃজনী ক্রিয়া। পুরুষার্থ ব্যাখ্যা: চার পুরুষার্থের সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গি — কাম থেকে মোক্ষ পর্যন্ত। রক্ষামূলক ব্যাখ্যা: লোকঐতিহ্যে কামভাস্কর্য বজ্রপাত থেকে মন্দির রক্ষা করে।

স্থাপত্য: নাগর রীতির পূর্ণতা

খাজুরাহোর মন্দিরগুলি নাগর (উত্তর ভারতীয়) রীতির সর্বোচ্চ নিদর্শন। বৈশিষ্ট্যসূচক বক্রাকার শিখর গর্ভগৃহের উপরে উত্থিত, আমলককলশ শীর্ষে। পঞ্চায়তন পরিকল্পনায় কেন্দ্রীয় মন্দির চারটি উপমন্দিরে পরিবেষ্টিত।

অভ্যন্তরীণ স্থান-অনুক্রম: অর্ধমণ্ডপ → মণ্ডপ → মহামণ্ডপ → অন্তরাল → গর্ভগৃহ। আলো ক্রমশ হ্রাস পায়, ভাস্কর্যময় বাইরে থেকে অন্ধকার গর্ভগৃহে দেবতার সাথে ঘনিষ্ঠ সাক্ষাৎকার — মায়া থেকে মোক্ষের স্থাপত্যিক কর্মসূচি।

পান্না জেলা থেকে আনা সূক্ষ্মকণা বেলেপাথরে নির্মিত, কোনো বন্ধনকারী রাসমিশ্রণ ছাড়াই।

পতন, পরিত্যাগ ও পুনরাবিষ্কার

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দিল্লি সুলতানাতের আক্রমণে চান্দেল শক্তি ক্ষয় পায়। ক্রমে জঙ্গল স্থানটি গ্রাস করে। ১৮৩৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্যাপ্টেন টি.এস. বার্ট পুনরাবিষ্কার করেন। পরে আলেকজান্ডার কানিংহাম পদ্ধতিগত জরিপ চালান।

মতঙ্গেশ্বর মন্দির (আনু. ৯০০-৯২৫) একমাত্র মন্দির যেখানে একাদিক্রমে পূজা অব্যাহত আছে — ২.৫ মিটার উচ্চ স্বয়ম্ভূ শিবলিঙ্গসহ।

ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও খাজুরাহো নৃত্য উৎসব

হিন্দু ও জৈন মন্দিরের সহাবস্থান চান্দেল সমাজের ধর্মীয় বহুত্ববাদের প্রমাণ। প্রতি ফেব্রুয়ারিতে খাজুরাহো নৃত্য উৎসব ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পের উৎসব — ভরতনাট্যম, কথক, ওড়িশি, কুচিপুড়ি, মণিপুরী প্রদর্শিত হয়। নিখরচায় প্রবেশ।

জীবনের সামগ্র্যের ধ্যান

খাজুরাহো মন্দিরগুলি একটি স্মারকীয় ঘোষণা — পবিত্র ও কামনাময়, ঐশ্বরিক ও মানবীয়, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক পরস্পরবিরোধী নয় বরং একটি একক, অবিভাজ্য বাস্তবতার বিভিন্ন দিক। মন্দির প্রদক্ষিণ করা মানে অস্তিত্বের পূর্ণতার মধ্য দিয়ে যাত্রা: বাইরের দেয়ালে জগতের সৌন্দর্য ও কোলাহল, স্তম্ভশালায় ইন্দ্রিয়ের ক্রমশ শান্ত হওয়া, এবং অন্ধকার গর্ভগৃহে নিরাকার দেবতার সাথে চরম সাক্ষাৎকার।

বৃহদারণ্যক উপনিষদ ঘোষণা করে: “পূর্ণম্ অদঃ, পূর্ণম্ ইদম্” — “সেটাও পূর্ণ, এটাও পূর্ণ।” খাজুরাহোতে এই প্রাচীন সত্য প্রতিটি প্রস্তরে খোদিত।