নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির, গুজরাতের সৌরাষ্ট্র উপকূলে গোমতী দ্বারকা ও বেট দ্বারকার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, ভগবান শিবের বারোটি স্বয়ম্ভূ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম — সেই দিব্য জ্যোতিস্তম্ভ যার মাধ্যমে মহাদেব পৃথিবীতে তাঁর অনন্ত, নিরাকার স্বরূপ প্রকাশ করেছেন। “নাগদের ঈশ্বর” (নাগ-ঈশ্বর) নামে পরিচিত এই ধাম শিব পুরাণে দারুকাবনের জ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে বর্ণিত, যা ভক্তদের সমস্ত বিষ থেকে — দৈহিক ও আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার — রক্ষা করার অলৌকিক শক্তির অধিকারী।
দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের বিখ্যাত সংস্কৃত শ্লোকে এই ধামের উল্লেখ রয়েছে:
নাগেশং দারুকাবনে “দারুকের বনে নাগেশ্বর”
ভক্ত সুপ্রিয় ও অসুর দারুকের কাহিনি
নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের পৌরাণিক উৎপত্তি শিব পুরাণের কোটি রুদ্র সংহিতায় (অধ্যায় ২৯-৩০) বর্ণিত, এবং এটি জ্যোতির্লিঙ্গ চক্রের সর্বাধিক নাটকীয় গাথাগুলির অন্যতম।
অসুরী দারুকা ও তার বরলাভ
কাহিনির সূত্রপাত দারুকা নামক এক অসুরীর সাথে, যিনি ছিলেন শক্তিশালী অসুর দারুকের পত্নী। দারুকা দেবী পার্বতীর অনন্য ভক্ত ছিলেন, এবং বহু বছরের কঠোর তপস্যায় তিনি এক বিস্ময়কর বর লাভ করেন — সমগ্র একটি অরণ্যকে যেখানে ইচ্ছা সেখানে বহন করার ক্ষমতা, এবং এই বনের মধ্যে কোনো অসুরকে বধ করা সম্ভব হবে না এমন প্রতিশ্রুতি। মাতা পার্বতী ভক্তের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে এই মন্ত্রমুগ্ধ অরণ্যের নাম রাখেন দারুকাবন। এই বিশাল বন, প্রায় ষোলো যোজন (আনুমানিক দুইশো কিলোমিটার) বিস্তৃত, পশ্চিম সমুদ্র উপকূলে অসুরদের চলমান সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।
দারুকের অত্যাচার
স্ত্রীর দৈবী সুরক্ষায় উদ্ধত হয়ে অসুর দারুক ও তার সেনাবাহিনী চারপাশের ভূমিতে ত্রাস সৃষ্টি করতে শুরু করে। তারা ঋষি-মুনিদের যজ্ঞ ভঙ্গ করল, বণিক জাহাজ লুণ্ঠন করল এবং নিরপরাধ মানুষদের বন্দি করল। যখন ভীত জনগণ মহর্ষি ঔর্বের কাছে রক্ষা প্রার্থনা করল, ঋষি অভিশাপ দিলেন যে অসুররা পৃথিবীর কোনো প্রাণীকে বধ করার চেষ্টা করলে তারা নিজেরাই ধ্বংস হবে। চতুর ও নির্মম দারুক এই অভিশাপ এড়াতে সম্পূর্ণ দারুকাবন সমুদ্রের তলদেশে স্থানান্তরিত করল, যেখান থেকে সে নাবিক ও পথিকদের নিপীড়ন অব্যাহত রাখল।
সুপ্রিয়ের অটল ভক্তি
দারুকের বন্দিদের মধ্যে সুপ্রিয় নামে এক বণিক ছিলেন, যিনি ভগবান শিবের অনন্য ভক্ত। অসুরের জলমগ্ন কারাগারে বন্দি থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিয় তাঁর সাধনা পরিত্যাগ করেননি। তিনি কারাগারে পার্থিব লিঙ্গ (মাটি দিয়ে নির্মিত শিবলিঙ্গ) স্থাপন করেন এবং প্রতিদিন মহাদেবের আরাধনা অব্যাহত রাখেন — শরীরে ভস্ম মেখে, রুদ্রাক্ষ মালা ধারণ করে, এবং অবিরাম পঞ্চাক্ষর মন্ত্র — ওঁ নমঃ শিবায় — জপ করতে থাকেন।
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে সুপ্রিয় ভয় বা যন্ত্রণায় বিচলিত না হয়ে পূর্ণ একাগ্রতায় তাঁর মৃত্তিকা লিঙ্গের উপাসনা করেন। তাঁর সহবন্দিরাও অনুপ্রাণিত হয়ে জপে যোগ দেন। ওঁ নমঃ শিবায় ধ্বনি অসুরের জলমগ্ন নগরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
দৈবী হস্তক্ষেপ
দারুক যখন জানতে পারল যে তার বন্দিরা শিবের নাম জপ করছে, সে ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠল। সে তরবারি তুলে সুপ্রিয়কে বধ করতে ছুটে এল। কিন্তু ঠিক যে মুহূর্তে তরবারি উত্তোলিত হলো, স্বয়ং ভগবান শিব আবির্ভূত হলেন — ভূমির এক দীপ্তিমান গহ্বর থেকে প্রকট হয়ে। প্রভু সুপ্রিয়কে পাশুপত অস্ত্র — সর্বাধিক ভয়ংকর দিব্যাস্ত্র — প্রদান করলেন। এই দিব্য অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সেই অসহায় বণিক অসুর সেনাবাহিনীকে সংহার করতে সক্ষম হলেন।
জ্যোতির্লিঙ্গের প্রতিষ্ঠা
দারুকের নিপাত ও বন্দিদের মুক্তির পর, ভগবান শিব সেই পবিত্র স্থানে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি জ্যোতির্লিঙ্গ — অনন্ত আলোর স্বয়ম্প্রকাশিত স্তম্ভ — রূপ ধারণ করলেন এবং নাগেশ্বর — “নাগদের ঈশ্বর” — নামে পরিচিত হলেন। দেবী পার্বতী নাগেশ্বরী নাম গ্রহণ করলেন এবং প্রভুর পাশে পূজিত হন। শিব পুরাণ অনুসারে এই জ্যোতির্লিঙ্গে “ভক্তদের সমস্ত বিষ থেকে, বিশেষত সর্প বিষ থেকে, রক্ষা করার” শক্তি বিদ্যমান, এবং কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্যের মতো আধ্যাত্মিক বিষ থেকেও মুক্তি প্রদান করে।
পবিত্র শিবলিঙ্গ ও তার অনন্য বৈশিষ্ট্য
নাগেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপিত মূল জ্যোতির্লিঙ্গটি দ্বারকা শিলা নামক একটি বিশেষ প্রস্তর থেকে নির্মিত। এই প্রস্তরের উপরিভাগে ক্ষুদ্র বৃত্তাকার চক্র চিহ্ন খোদিত, এবং লিঙ্গের আকৃতি ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষের (তিন মুখবিশিষ্ট রুদ্রাক্ষ) অনুরূপ।
এই জ্যোতির্লিঙ্গের স্থাপত্যগত অনন্যতা হলো শিবলিঙ্গ দক্ষিণমুখী অথচ গোমুখ (অভিষেক জল নির্গমন পথ) পূর্বমুখী। অধিকাংশ শিব মন্দিরে লিঙ্গ পূর্বমুখী ও গোমুখ উত্তরমুখী থাকে। এই অসাধারণ দক্ষিণমুখী অভিমুখতা নাগেশ্বরকে শিবের দক্ষিণামূর্তি রূপের সঙ্গে সংযুক্ত করে — পরমজ্ঞান, মৌন ও যোগের দক্ষিণাভিমুখ গুরু।
লিঙ্গের উপর একটি রৌপ্য নাগ (সর্প) কুণ্ডলিত এবং রৌপ্য বস্ত্রে আবৃত। লিঙ্গের পশ্চাতে দেবী পার্বতীর নাগেশ্বরী রূপের মূর্তি স্থাপিত। গর্ভগৃহে ভগবান গণেশ ও হনুমানের মূর্তিও রয়েছে, এবং শিবের দিব্য বাহন নন্দীর একটি পৃথক মন্দির বিদ্যমান।
মন্দির স্থাপত্য
নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির ঐতিহ্যবাহী মেরু রীতির হিন্দু মন্দির স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। মন্দিরের নকশা বাস্তু শাস্ত্রের নীতি অনুসারে রচিত এবং মানবদেহের শয়ন (বিশ্রাম) ভঙ্গিতে কল্পিত।
মানবাকৃতি বিন্যাস
স্থাপত্য পরিকল্পনা একটি পবিত্র দেহরূপে পাঠযোগ্য:
- মহাদ্বার (প্রধান প্রবেশদ্বার): পদদ্বয়ের প্রতিনিধি, তীর্থযাত্রীর যাত্রার সূচনাবিন্দু
- গণেশ-হনুমান মণ্ডপ: বাহুদ্বয়ের প্রতিনিধি, ভক্তের পথের রক্ষক
- সভা মণ্ডপ (সমাবেশ কক্ষ): দেহমধ্যের প্রতিনিধি, ভক্তসমাগমের স্থান
- অন্তরাল (মধ্যবর্তী কক্ষ): উপাসক সমষ্টি ও দেবতার মধ্যে সংক্রমণ স্থল
- গর্ভগৃহ: মস্তকের প্রতিনিধি, চৈতন্যের কেন্দ্র যেখানে জ্যোতির্লিঙ্গ বিরাজমান
গর্ভগৃহ ভূমি থেকে প্রায় ছয় ইঞ্চি নীচে অবস্থিত, যা নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গকে সেই বিরল জ্যোতির্লিঙ্গগুলির অন্যতম করে তোলে যা ভূগর্ভস্থ গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত। প্রভুর দিকে অগ্রসর হতে হতে ভূমিতে ক্রমশ নিম্নগামী হওয়া আত্মার অন্তর্যাত্রার প্রতীক।
বর্তমান কাঠামো
বর্তমান মন্দির কাঠামো প্রায় ১১০ ফুট উচ্চ এবং উপকূলীয় পরিবেশ সহনের জন্য ক্ষয়রোধী রাসায়নিক প্রলেপযুক্ত আরসিসি দেয়ালে নির্মিত। বাইরের আস্তরণ পোরবন্দর প্রস্তরে — সেই ক্রিমবর্ণ চুনাপাথর যা গুজরাতের অনেক ঐতিহাসিক মন্দিরে ব্যবহৃত। নলাকার খাঁজকাটা স্তম্ভ, মর্মর কক্ষ এবং স্বস্তিক ও কৈলাস পর্বতের অলঙ্করণ সমৃদ্ধ পদ্মথিম শীর্ষদেশ অভ্যন্তরীণ সজ্জাকে মনোহর করে তুলেছে।
বিশাল শিব মূর্তি
নাগেশ্বর মন্দির চত্বরের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক আকর্ষণ হলো ২৫ মিটার (প্রায় ৮২ ফুট) উচ্চ ভগবান শিবের ধ্যানমগ্ন উপবিষ্ট বিশাল মূর্তি। ব্রোঞ্জ বর্ণের এই বিরাট প্রতিমা, ভারতের উচ্চতম উন্মুক্ত আকাশের নিচে শিব মূর্তিগুলির অন্যতম, একটি বৃহৎ সরোবর ও সবুজ উদ্যানের সামনে বিরাজমান। দ্বারকার দিক থেকে আগত দর্শনার্থীরা সর্বপ্রথম এই স্মারক মূর্তির দর্শন পান, যা প্রাচীন ধামে প্রবেশের পূর্বে বিস্ময় ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির অনুভূতি জাগ্রত করে।
স্থান বিতর্ক: তিন দাবিদার
“প্রকৃত” নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের পরিচয় পণ্ডিত ও ভক্তদের মধ্যে আলোচনার বিষয়। ভারতজুড়ে তিনটি মন্দির শিব পুরাণে বর্ণিত মূল ধাম হওয়ার দাবি করে:
১. নাগেশ্বর, দ্বারকা (গুজরাত)
সর্বাধিক ব্যাপকভাবে স্বীকৃত দাবিদার। সমর্থকদের যুক্তি: “দারুকাবন” হলো “দ্বারকার” একটি রূপান্তর, এবং মন্দিরের উপকূলীয়, সমুদ্র-সন্নিকট অবস্থান পুরাণে বর্ণিত দারুকের জলমগ্ন বন সাম্রাজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
২. আউন্ধা নাগনাথ (মহারাষ্ট্র)
মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলায় অবস্থিত আউন্ধা নাগনাথ মন্দির একটি প্রাচীন ধাম যাকে অনেক দাক্ষিণাত্যের পণ্ডিত মূল নাগেশ্বর হিসেবে চিহ্নিত করেন। “নাগনাথ” (নাগদের প্রভু) নামের “নাগেশ্বরের” সঙ্গে সাদৃশ্য এবং শতাব্দীপ্রাচীন অবিচ্ছিন্ন পূজা পরম্পরা এর দাবিকে শক্তিশালী করে।
৩. জাগেশ্বর (উত্তরাখণ্ড)
উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন পাহাড়ে আলমোড়ার নিকট জাগেশ্বর মন্দির সমষ্টি — সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর ১০০-রও বেশি প্রাচীন প্রস্তর মন্দিরের সমাহার — কিছু উত্তরাঞ্চলীয় ঐতিহ্য দ্বারা নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত। “জাগেশ্বর” কে “নাগেশ্বরের” স্থানীয় ধ্বনি পরিবর্তন বলে মনে করা হয়।
মূলধারার তীর্থযাত্রা পদ্ধতিতে আজ গুজরাতের দ্বারকা মন্দিরই দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ পরিক্রমায় সর্বাধিক অন্তর্ভুক্ত।
দ্বারকা ও কৃষ্ণ ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ
নাগেশ্বর মন্দিরের দ্বারকা — ভগবান কৃষ্ণের কিংবদন্তি রাজধানী ও চার ধামের অন্যতম — নৈকট্য এটিকে ভারতের ঘনতম পবিত্র ভূগোলে স্থাপন করে। দ্বারকা নাগেশ্বর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূর, এবং তীর্থযাত্রীরা ঐতিহ্যগতভাবে একই দিনে উভয় ধাম দর্শন করেন। স্থানীয় পরম্পরা অনুসারে স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণ নাগেশ্বরে রুদ্রাভিষেক সম্পন্ন করেছিলেন, যা এই তীর্থস্থানে বৈষ্ণব ও শৈব ঐতিহ্যের ঐক্যকে প্রতিপন্ন করে।
দ্বারকা অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে অন্তত পাঁচটি পূর্ববর্তী নগরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দ্বারকার উপকূল থেকে দূরে সামুদ্রিক প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপে জলমগ্ন কাঠামোও আবিষ্কৃত হয়েছে, যা পুরাণের “জলমগ্ন দারুকাবনের” ঐতিহাসিক ভিত্তি হতে পারে। বাঙালি পণ্ডিত ও সমুদ্র প্রত্নতত্ত্ববিদ ডঃ এস. আর. রাও ছিলেন দ্বারকার জলমগ্ন ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধানের অন্যতম পথিকৃৎ, যিনি সমুদ্রগর্ভে প্রাচীন নগর কাঠামোর সন্ধান পেয়েছিলেন।
পূজা পদ্ধতি ও অনুষ্ঠান
দৈনিক পূজা কার্যক্রম
- মঙ্গল আরতি: প্রত্যুষে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ও মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি সহ প্রথম আরতি
- শৃঙ্গার পূজা: জ্যোতির্লিঙ্গকে পুষ্প, চন্দন, বিভূতি ও বিল্বপত্র দ্বারা সজ্জিত করা
- বিল্ব অর্চনা: ভগবান শিবের পরম প্রিয় পবিত্র বিল্বপত্র অর্পণ এবং শিবের ১০৮ নাম জপ
- রুদ্রাভিষেক: সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক অনুষ্ঠান — দুগ্ধ, দধি, মধু, ঘৃত ও জলে লিঙ্গের ক্রমিক অভিষেক, পুরোহিতদের দ্বারা যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রম স্তোত্র পাঠ
- সন্ধ্যা আরতি: সায়ংকালীন দীপ আরতি ও ভজন-কীর্তন
দর্শন সময়
- প্রাতঃকালীন: সকাল ৫:৩০ থেকে দুপুর ১:৩০ পর্যন্ত
- সায়ংকালীন: সন্ধ্যা ৫:০০ থেকে রাত ৯:৩০ পর্যন্ত
উৎসব ও পার্বণ
মহাশিবরাত্রি
শিবের মহান রাত্রি (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) নাগেশ্বরের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। সহস্র ভক্ত রাত্রিব্যাপী উপবাস ও জাগরণ করেন, অবিরাম অভিষেক ও পঞ্চাক্ষর মন্ত্র জপ করেন। এই রাতে মন্দির সমগ্র রাত্রি খোলা থাকে। বাংলার অনেক শিবভক্তও এই তিথিতে দ্বারকা তীর্থযাত্রা সম্পন্ন করেন।
শ্রাবণ মাস
বর্ষাকালের শ্রাবণ মাস (জুলাই-আগস্ট) শিব পূজার জন্য বিশেষভাবে শুভ। এই মাসের প্রতিটি সোমবার উপবাসী ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে যারা শিবলিঙ্গে জলাভিষেক সম্পন্ন করেন। বাংলায় শ্রাবণ মাসে শিব পূজার বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে — “শ্রাবণের বৃষ্টি ঝরে শিবের মাথায়” — এই লোকবিশ্বাসে বাঙালি শিবভক্তরা এই মাসে বিশেষ উদ্যমে শিবের আরাধনা করেন।
কার্তিক পূর্ণিমা
কার্তিক মাসের পূর্ণিমায় (নভেম্বর) ভক্তেরা গোমতী নদীতে আনুষ্ঠানিক স্নান সেরে মন্দিরে বিশেষ পূজা করেন। বাংলায় এই তিথি রাস পূর্ণিমা হিসেবেও পরিচিত।
নাগ পঞ্চমী
মন্দিরের সর্পদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে নাগ পঞ্চমী (জুলাই-আগস্ট) এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভক্তেরা সর্প মন্দিরে দুগ্ধ নিবেদন করেন এবং নাগেশ্বরের কাছে সর্প-সম্পর্কিত বিপদ থেকে রক্ষা প্রার্থনা করেন। বাংলার মনসা পূজার সঙ্গে এই উৎসবের সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য লক্ষণীয় — উভয়ই সর্প দেবতার আরাধনা ও বিষ থেকে রক্ষার প্রার্থনায় নিবেদিত।
তীর্থযাত্রা পথ: পশ্চিমাঞ্চলীয় পবিত্র পরিক্রমা
নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ সাধারণত একটি বৃহত্তর সৌরাষ্ট্র তীর্থ পরিক্রমার অংশ হিসেবে দর্শন করা হয়:
১. দ্বারকাধীশ মন্দির (দ্বারকা): প্রধান কৃষ্ণ মন্দির ও চার ধাম তীর্থ, নাগেশ্বর থেকে ১৭ কিমি ২. বেট দ্বারকা: কৃষ্ণের প্রকৃত আবাসস্থল বলে বিশ্বাসিত দ্বীপ, নৌকায় যাতায়াতযোগ্য ৩. নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ: দ্বারকা ও বেট দ্বারকার পথে ৪. গোপী তালাব: বৃন্দাবনের গোপীদের সঙ্গে সম্পর্কিত পবিত্র সরোবর ৫. সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ (ভেরাভাল): দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে প্রথম, প্রায় ২৩০ কিমি দক্ষিণ-পূর্বে
এই পরিক্রমা তীর্থযাত্রীদের একটি যাত্রায় দুটি জ্যোতির্লিঙ্গ — নাগেশ্বর ও সোমনাথ — এবং চার ধাম তীর্থ দ্বারকা দর্শনের সুযোগ দেয়।
নাগেশ্বরের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
শিব পুরাণের রুদ্র সংহিতা ঘোষণা করে যে নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গে সমস্ত বিষ নির্মূল করার অনন্য শক্তি বিদ্যমান। এই “বিষ” বহু স্তরে অনুধাবনযোগ্য। আক্ষরিক অর্থে, এই ধাম সর্প বিষ থেকে রক্ষাকারী বলে বিশ্বাসিত। রূপক অর্থে, এই “বিষ” আত্মার ছয় শত্রু — কাম (কামনা), ক্রোধ (রোষ), লোভ (লালসা), মোহ (ভ্রম), মদ (অহঙ্কার), ও মাৎসর্য (ঈর্ষা) — যা জীবকে সংসারচক্রে আবদ্ধ রাখে।
সুপ্রিয়ের কাহিনি এক শক্তিশালী শিক্ষা প্রদান করে: সবচেয়ে অন্ধকারময় পরিস্থিতিতেও — কারারুদ্ধ, মৃত্যুভীত, শত্রুবেষ্টিত — প্রভুর প্রতি অটল ভক্তি মুক্তি দান করে। সুপ্রিয় বস্তুগত অস্ত্রে যুদ্ধ করেননি; তাঁর একমাত্র অস্ত্রাগার ছিল শ্রদ্ধা ও শিবের পবিত্র নাম। বাঙালি সাধক রামকৃষ্ণ পরমহংস যেমন বলতেন, “নামের মাহাত্ম্য অপরিসীম” — সুপ্রিয়ের কাহিনি সেই সত্যের পৌরাণিক প্রতিফলন।
নাগেশ্বর দর্শন: ব্যবহারিক তথ্য
কীভাবে পৌঁছাবেন:
- বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর জামনগর (প্রায় ১৩৭ কিমি), মুম্বই ও দিল্লির সঙ্গে সংযুক্ত
- রেলপথে: দ্বারকা রেলওয়ে স্টেশন প্রায় ১৭ কিমি দূর, প্রধান নগরগুলির সঙ্গে সংযুক্ত; কলকাতা থেকে সরাসরি ট্রেন দ্বারকা পর্যন্ত যায়
- সড়কপথে: রাষ্ট্রীয় সড়ক দ্বারা সুগম; মন্দিরটি দ্বারকা-বেট দ্বারকা সড়কে অবস্থিত
দর্শনের সর্বোত্তম সময়: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মনোরম উপকূলীয় আবহাওয়া। মহাশিবরাত্রি (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) ও শ্রাবণ মাস (জুলাই-আগস্ট) সর্বাধিক শুভ সময়কাল।
নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ ভক্তির শাশ্বত শক্তির সাক্ষ্য। সমুদ্র ও স্থলের মিলনে, শৈব ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যের সমন্বয়ে, প্রাচীন পুরাণকথা ও জীবন্ত উপাসনার মাঝে, এই পবিত্র ধাম সেই তীর্থযাত্রীদের আহ্বান করে চলে যাঁরা জাগতিক বিষ থেকে প্রভুর রক্ষাকবচ ও কষ্টকে মুক্তিতে রূপান্তরকারী দিব্য কৃপা অন্বেষণ করেন।