শবরিমলা শ্রী ধর্মশাস্তা মন্দির (ശബരിമല ശ്രീ ധർമ്മ ശാസ്താ ക്ഷേത്രം), কেরলের পত্তনমতিট্টা জেলায় পশ্চিমঘাটের গভীর অরণ্যের মধ্যে ৯১৪ মিটার (৩,০০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত, পৃথিবীর অন্যতম অসাধারণ তীর্থস্থান। ভগবান অয়্যপ্পন — যিনি ধর্মশাস্তা ও মণিকণ্ঠন নামেও পরিচিত — এঁকে উৎসর্গীকৃত এই পার্বত্য মন্দিরে মণ্ডলম্–মকরবিলক্কু মৌসুমে প্রতিবছর আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কোটি ভক্ত সমাগত হন, যা কুম্ভমেলা ও হজের সমতুল্য বিশ্বের বৃহত্তম বার্ষিক ধর্মীয় সমাবেশগুলির অন্যতম। হরিহরপুত্র — ভগবান শিব ও ভগবান বিষ্ণুর (মোহিনী অবতার) দিব্য পুত্র — এঁর মন্দির হিসেবে এটি শৈব ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যের এক অনন্য সমন্বয়।
অয়্যপ্পনের কিংবদন্তি: হরিহরপুত্র
শবরিমলার পৌরাণিক কাহিনি এমন এক দিব্য জন্মে প্রোথিত যা সাম্প্রদায়িক সীমানা অতিক্রম করে। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণের ভূতনাথ উপাখ্যান অংশ অনুসারে, যখন দেবগণ মহিষী নামক এক শক্তিশালী রাক্ষসীর অত্যাচার থেকে মুক্তি কামনা করছিলেন, তখন শিব ও বিষ্ণুর দিব্য শক্তির সম্মিলনে এক ত্রাণকর্তার জন্ম হলো।
মহিষী ছিলেন কুখ্যাত মহিষাসুরের ভগিনী, যাঁকে দেবী দুর্গা বধ করেছিলেন। ক্রোধ ও শোকে জ্বলে মহিষী কঠোর তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর লাভ করলেন যে তাঁকে কেবল শিব ও বিষ্ণুর সম্মিলিত সন্তানই বধ করতে পারবে — যে শর্ত তিনি অসম্ভব বলে মনে করতেন। এই বরে সশক্ত হয়ে মহিষী ত্রিলোক জুড়ে তাণ্ডব চালালেন।
বরের শর্ত পূরণ করতে ভগবান বিষ্ণু মোহনীয় নারীরূপ মোহিনী ধারণ করলেন। শিব ও মোহিনীর মিলনে জন্ম নিলেন এক তেজোময় শিশু — হরিহরপুত্র, যাঁর কণ্ঠে এক দিব্য ঘণ্টা শোভিত ছিল, যে কারণে তাঁকে মণিকণ্ঠন (“কণ্ঠে মণিধারী”) বলা হলো। এই শিশুকে পম্পা নদীর তীরে রাখা হলো, যেখানে পণ্ডালমের রাজা রাজশেখর তাঁকে আবিষ্কার করে নিজপুত্র হিসেবে দত্তক নিলেন।
মণিকণ্ঠন ও মহিষী বধ
রাজপুত্র মণিকণ্ঠন পণ্ডালমের রাজপ্রাসাদে বেড়ে উঠলেন এবং অসাধারণ যুদ্ধকুশলতা ও আধ্যাত্মিক প্রতিভার পরিচয় দিলেন। কিংবদন্তি অনুসারে, রানি অসুস্থতার ছলে বাঘিনীর দুধ দাবি করলেন — যা ছিল রাজপুত্রকে অরণ্যে মৃত্যুর মুখে পাঠানোর ষড়যন্ত্র — মণিকণ্ঠন নির্ভয়ে বনের পথে চললেন।
বর্তমান এরুমেলির কাছে গভীর অরণ্যে মণিকণ্ঠন রাক্ষসী মহিষীর মুখোমুখি হলেন এবং তাঁকে বধ করলেন, যার মধ্য দিয়ে তাঁর দিব্য অবতারের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ হলো। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ জানায় যে মহিষী প্রকৃতপক্ষে লীলা নামে এক গন্ধর্ব কন্যা ছিলেন যাঁকে রাক্ষসীরূপ ধারণের অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল, এবং অয়্যপ্পনের হাতে তাঁর মৃত্যুর পর তিনি অভিশাপ থেকে মুক্ত হলেন। কিছু ঐতিহ্য অনুসারে তিনি বিজয়ী রাজপুত্রকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন, কিন্তু অয়্যপ্পন চিরকাল ব্রহ্মচর্য (নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্যম্) পালনের ব্রত নিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করলেন।
বিজয়ের পর মণিকণ্ঠন এক বিশাল বাঘের পিঠে চেপে, বাঘের দলসহ রাজপ্রাসাদে ফিরলেন — যা তাঁর দিব্য পরিচয় প্রকাশ করল। অতঃপর তিনি শবরিমলার পর্বতশীর্ষে আরোহণ করে গর্ভগৃহে বিলীন হলেন। পণ্ডালমের রাজা সেই স্থানে প্রথম মন্দির নির্মাণ করলেন এবং পণ্ডালম রাজবংশ আজও নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের বংশানুক্রমিক তত্ত্বাবধান করেন।
আঠারো পবিত্র সিঁড়ি (পতিনেট্টাম্পডি)
শবরিমলার সবচেয়ে প্রতীকী বৈশিষ্ট্য হলো পতিনেট্টাম্পডি — সেই আঠারো পবিত্র সিঁড়ি যেগুলি আরোহণ করে প্রতিটি তীর্থযাত্রী গর্ভগৃহে (সন্নিধানম্) পৌঁছান। মূলত গ্রানাইট থেকে খোদিত এবং ১৯৮৫ সালে পঞ্চলোহ (সোনা, রুপো, তামা, লোহা ও টিনের সংমিশ্রধাতু) দিয়ে আবৃত এই সিঁড়িগুলি গভীর আধ্যাত্মিক প্রতীকতা বহন করে:
- পঞ্চ ইন্দ্রিয় (পঞ্চেন্দ্রিয়): সিঁড়ি ১–৫ দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শের প্রতীক।
- অষ্ট আবেগ (অষ্টরাগ): সিঁড়ি ৬–১৩ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, অসূয়া ও দম্ভের প্রতীক।
- ত্রিগুণ: সিঁড়ি ১৪–১৬ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ-এর প্রতীক।
- বিদ্যা ও অবিদ্যা: সিঁড়ি ১৭ ও ১৮ জ্ঞান ও অজ্ঞানের প্রতীক।
অপর একটি ঐতিহ্য অনুসারে, ভগবান অয়্যপ্পন আঠারোটি অস্ত্রের অধিপতি ছিলেন এবং গর্ভগৃহে বিলীন হওয়ার সময় প্রতিটি সিঁড়িতে একটি করে অস্ত্র সমর্পণ করেন। কেবল যাঁরা পবিত্র ইরুমুডিকেট্টু বহন করেন এবং ৪১ দিনের ব্রতম্ সম্পন্ন করেছেন, তাঁরাই পতিনেট্টাম্পডিতে আরোহণ করতে পারেন। যে তীর্থযাত্রী আঠারো বার এই সিঁড়ি আরোহণ করেছেন, তিনি গুরুস্বামী উপাধি লাভ করেন।
৪১ দিনের ব্রতম্: ত্যাগের সাধনা
শবরিমলা তীর্থযাত্রার প্রস্তুতি নিজেই এক রূপান্তরকারী আধ্যাত্মিক সাধনা। যাত্রার পূর্বে ৪১ দিন ধরে প্রতিটি তীর্থযাত্রীকে কঠোর ব্রতম্ পালন করতে হয়:
- খাদ্য শৃঙ্খলা: সম্পূর্ণ নিরামিষ; মদ্যপান, তামাক ও সমস্ত নেশাদ্রব্য বর্জন।
- ব্রহ্মচর্য: কামাচার থেকে সম্পূর্ণ সংযম।
- পোশাক: কেবল কালো বা গাঢ় নীল বস্ত্র — ত্যাগ ও সাম্যের প্রতীক — প্রতিটি তীর্থযাত্রী, জাতি-বর্ণ-সম্পদ নির্বিশেষে, অভিন্ন দেখতে হন।
- খালি পায়ে হাঁটা: ব্রতম্ কালে ভক্তেরা পাদুকা বর্জন করেন।
- দৈনিক পূজা: প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায় পূজা, এবং “স্বামিয়ে শরণম্ অয়্যপ্পা” মন্ত্রের অবিরাম জপ।
- মালা-ধারণম্: গুরুর কাছ থেকে প্রাপ্ত তুলসী বা রুদ্রাক্ষ মালা ধারণ।
এই ৪১-দিনের পর্বে প্রতিটি পুরুষ ভক্ত পরস্পরকে “স্বামী” বলে সম্বোধন করেন — যাতে জাতি, শ্রেণি ও সামাজিক ক্রমের সকল ভেদ বিলুপ্ত হয়। ভগবদ্গীতায় (১৬.১–৩) বর্ণিত তপঃ, শম ও দম — এই দৈবসম্পদের গুণাবলি এই ব্রতম্ অনুশীলন করায়। এই সমতাবাদ অয়্যপ্পন ঐতিহ্যের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য।
ইরুমুডিকেট্টু: পবিত্র পুটলি
যাত্রার পূর্বে ভক্তেরা কেট্টুনীর নামক অনুষ্ঠানে ইরুমুডিকেট্টু প্রস্তুত করেন। এটি দুটি কক্ষবিশিষ্ট কাপড়ের পুটলি:
- মুন্মুডি (সম্মুখ কক্ষ): দেবতার জন্য উপচার — ঘিতে পূর্ণ নারকেল (নেয় অভিষেকম্), কর্পূর, ধূপ, চন্দন, হলুদ ও অন্যান্য পূজার সামগ্রী।
- পিন্মুডি (পশ্চাৎ কক্ষ): তীর্থযাত্রীর ব্যক্তিগত সামগ্রী — চাল, গুড় ও যাত্রার জন্য সাদামাটা খাদ্য।
এরুমেলি ও পেট্টা থুল্লল ঐতিহ্য
তীর্থযাত্রা ঐতিহ্যগতভাবে এরুমেলি থেকে শুরু হয়, যা শবরিমলা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে এবং যেখানে মণিকণ্ঠন মহিষী বধ করেছিলেন। এখানে ধর্মশাস্তা মন্দির ও ভাভর পল্লি (মসজিদ) উভয়ই অবস্থিত।
পেট্টা থুল্লল হাজার হাজার ভক্তের দ্বারা এরুমেলির রাস্তায় সম্পাদিত এক উন্মত্ত, পরমানন্দময় নৃত্য। হলুদ ও নানান রঙে রঞ্জিত ভক্তেরা ভগবান অয়্যপ্পনের মহিষী বধের পুনরভিনয় করে উদ্দাম নৃত্য করেন। এই নৃত্য চেরিয়ম্বলম্ মন্দির থেকে শুরু হয়ে নগরের মধ্য দিয়ে ভাভর মসজিদে শেষ হয় — শবরিমলা ঐতিহ্যের আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির এক শক্তিশালী প্রকাশ।
ভাভর ঐতিহ্য: আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির আদর্শ
শবরিমলা তীর্থযাত্রার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভাভর স্বামীর পূজন — একজন মুসলিম যোদ্ধা-সন্ত যিনি, কিংবদন্তি অনুসারে, ভগবান অয়্যপ্পনের নিবেদিত সহচর ও শপথবদ্ধ বন্ধু ছিলেন। ঐতিহ্য অনুসারে ভাভর এরুমেলিতে মহিষীর বিরুদ্ধে মণিকণ্ঠনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। বিজয়ের পর যখন অয়্যপ্পন শবরিমলার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন, তিনি ভাভরকে এরুমেলিতে থাকতে বললেন এবং ভক্তদের নির্দেশ দিলেন যে শবরিমলা যাওয়ার আগে সর্বদা ভাভরকে দর্শন করতে হবে।
ভাভর পল্লি (ভাভর মসজিদ) ৫০০ বছরের বেশি প্রাচীন বলে বিশ্বাস করা হয় এবং এটি দুটি হিন্দু মন্দিরের মাঝে অবস্থিত। হিন্দু তীর্থযাত্রীরা মসজিদে প্রবেশ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং কষায়ম্ (ভেষজ পানীয়) গ্রহণ করেন। বার্ষিক চন্দনক্কুডম শোভাযাত্রা — যেখানে চন্দনের পাত্র মসজিদ থেকে শবরিমলায় বহন করা হয় — এই আন্তঃধর্মীয় বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করে। এই ঐতিহ্য ভারতের সমন্বয়বাদী আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
বাংলার ভক্তদের কাছে এই আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থানের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং লালন ফকির থেকে শুরু করে বাউল ঐতিহ্য পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ সর্বত্র বিদ্যমান।
মন্দির: স্থাপত্য ও পবিত্র ভূগোল
শবরিমলা সন্নিধানম্ (মন্দির চত্বর) পেরিয়ার ব্যাঘ্র অভয়ারণ্যের মধ্যে আঠারোটি শৃঙ্গ দ্বারা পরিবেষ্টিত পাহাড়ের ওপর অবস্থিত। গর্ভগৃহে ভগবান অয়্যপ্পনের প্রতিষ্ঠিত পঞ্চলোহ মূর্তি রয়েছে, প্রায় দেড় ফুট উঁচু, যোগপট্টাসন ভঙ্গিতে — হাঁটুর চারপাশে যোগপট্ট বাঁধা, ডান হাত চিন্মুদ্রায়। এই মূর্তি ১৯৫০ সালে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পূর্ববর্তী পাথরের প্রতিমার পরিবর্তে স্থাপিত হয়েছিল।
পম্পা নদী — কেরলের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী, দক্ষিণ গঙ্গা নামে পূজিত — পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত। তীর্থযাত্রীরা আরোহণের পূর্বে পম্পায় পবিত্র স্নান (স্নানম্) করেন।
মকর জ্যোতি ও মকরবিলক্কু উৎসব
তীর্থযাত্রা মৌসুমের চরম পরিণতি মকরবিলক্কু উৎসব, যা মকর সংক্রান্তির (১৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়। যখন লক্ষ লক্ষ ভক্ত সন্নিধানমে সমবেত হন, তখন মন্দির থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে পোন্নম্বলমেডু পাহাড়ে এক দীপ্তিমান শিখা — মকর জ্যোতি — দৃশ্যমান হয়। এই শিখা ত্রিবাঙ্কুর দেবস্বোম বোর্ড কর্তৃক পবিত্র পাহাড়ে প্রজ্বলিত করা হয় এবং একই সময়ে সিরিয়াস নক্ষত্রের (জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মকর জ্যোতি) উদয় ঘটে — এক অতিলৌকিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক-ভৌম সংযোগ।
সেই মুহূর্তেই পবিত্র অলংকার (তিরুভাভরণম্) — স্বর্ণ তিডম্বু (দিব্য পেটিকা) ও আনুষ্ঠানিক অলংকার — পণ্ডালম রাজপ্রাসাদ থেকে মহাসমারোহে এনে দেবতার সম্মুখে প্রদর্শিত হয়।
বাংলায় মকর সংক্রান্তি ও পৌষ সংক্রান্তি নামে পরিচিত এই দিনটি বাঙালিদের কাছেও অত্যন্ত পবিত্র — গঙ্গাসাগর মেলা থেকে শুরু করে তিল-পিঠার উৎসব পর্যন্ত। শবরিমলার মকরবিলক্কু এই একই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনাকে কেরলীয় ঐতিহ্যে উদযাপন করে।
তীর্থযাত্রার বিপুল মাত্রা
- মণ্ডলম্–মকরবিলক্কু মৌসুমে প্রায় ৬০ দিনে ৪–৫ কোটি ভক্ত মন্দিরে দর্শন করেন।
- শীর্ষ দিনগুলিতে, বিশেষত মকরবিলক্কুর সময়, ৫ থেকে ১০ লক্ষ তীর্থযাত্রী একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারেন।
- তীর্থপথ ভিত্তিশিবির থেকে সন্নিধানম্ পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটারেরও বেশি ঘন অরণ্যের মধ্য দিয়ে প্রসারিত।
মহিলা প্রবেশ বিতর্ক: ঐতিহ্য ও সাংবিধানিক অধিকার
শবরিমলা সাম্প্রতিক দশকে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সাংস্কৃতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ঐতিহ্যগতভাবে ঋতুমতী বয়সের মহিলাদের (আনুমানিক ১০–৫০ বছর) মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, যা ভগবান অয়্যপ্পনের নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য ব্রতের ওপর ভিত্তি করে।
২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ৪:১ রায়ে বয়স-ভিত্তিক নিষেধাজ্ঞাকে সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদ (সাম্যের অধিকার) ও ২৫ অনুচ্ছেদ (ধর্মীয় স্বাধীনতা) লঙ্ঘন ঘোষণা করে বাতিল করেন। বিচারপতি ইন্দু মালহোত্রা ভিন্নমত প্রকাশ করে যুক্তি দেন যে আদালতের কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মৌলিক ধর্মীয় আচারে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। ২০১৯ সালের নভেম্বরে একটি বৃহত্তর বেঞ্চ ৩:২ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিষয়টি বিচারাধীন রাখেন। বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে এবং ঐতিহ্য ও সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য: তত্ত্বমসির পথ
শবরিমলা তীর্থযাত্রার ব্যাখ্যা প্রায়ই অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে করা হয়। অয়্যপ্পন ভক্তদের মধ্যে পারস্পরিক অভিবাদন “তত্ত্বমসি” (“তুমিই সেই,” ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬.৮.৭) — অদ্বৈত শিক্ষার সমর্থন যে জীবাত্মা ও ব্রহ্ম অভিন্ন। সমগ্র তীর্থযাত্রা — ৪১ দিনের তপস্যা, সামাজিক পরিচয়ের বিসর্জন, অরণ্যের মধ্য দিয়ে যাত্রা, আঠারো সিঁড়িতে আরোহণ, এবং অবশেষে ভগবান অয়্যপ্পনের দর্শন — অজ্ঞান থেকে মুক্তির আধ্যাত্মিক যাত্রার সাক্ষাৎ রূপক।
ভগবদ্গীতার (১৮.৬৬) উপদেশ — সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মাম্ একং শরণং ব্রজ — “সমস্ত ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণে এসো” — “স্বামিয়ে শরণম্ অয়্যপ্পা” জপে প্রতিধ্বনিত হয়। বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শরণাগতির দর্শনের সঙ্গে এই শরণাগতি তত্ত্বের গভীর মিল রয়েছে।
শবরিমলা কেবল একটি মন্দির নয়, বরং এক সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক বাস্তুতন্ত্র — যেখানে অরণ্য, পর্বত, নদী, অনুষ্ঠান ও ত্যাগ একত্রিত হয়ে হিন্দু জগতের অন্যতম গভীরতম তীর্থানুভব সৃষ্টি করে।