ভূমিকা: দেবাদিদেবের জন্য গ্র্যানাইটের পর্বত

তাঞ্জাভুর — চোল রাজবংশের সাম্রাজ্যিক রাজধানী — এর হৃদয়ে এক মন্দির দাঁড়িয়ে আছে যা এক সহস্রাব্দের সময়, যুদ্ধ ও আবহাওয়াকে পরাজিত করেছে। বৃহদীশ্বর মন্দির, স্থানীয়ভাবে পেরুবুড়ৈয়ার কোবিল (“মহান প্রভুর মন্দির”) এবং কথ্যভাষায় তঞ্জৈ পেরিয় কোবিল (“তাঞ্জাভুরের বড় মন্দির”) নামে পরিচিত, চোল স্থাপত্যের সর্বোচ্চ অর্জন। চোল সম্রাট রাজরাজ প্রথম দ্বারা ১০০৩ থেকে ১০১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত, মন্দিরের পিরামিডাকৃতি বিমান ২১৬ ফুট (প্রায় ৬৬ মিটার) উচ্চতায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, এটিকে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ মন্দির শিখরগুলির অন্যতম করেছে।

ইউনেস্কো বৃহদীশ্বর মন্দিরকে ১৯৮৭ সালে (২০০৪-এ সম্প্রসারিত) “মহান জীবন্ত চোল মন্দির” বিশ্ব ঐতিহ্য স্থানের অংশ হিসেবে মনোনীত করে, স্বীকার করে যে এটি “স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চিত্রকলা ও ব্রোঞ্জ ঢালাইয়ে চোলদের উজ্জ্বল সাফল্যের সাক্ষ্য”। “জীবন্ত” শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ: বহু প্রাচীন স্মারকের বিপরীতে, বৃহদীশ্বর মন্দির একটি সম্পূর্ণ সক্রিয় পূজাকেন্দ্র, যেখানে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে অবিচ্ছিন্নভাবে দৈনিক পূজা চলছে।

নির্মাতা: রাজরাজ চোল প্রথম

দক্ষিণ সাগরের সম্রাট

রাজরাজ চোল প্রথম (রাজত্বকাল ৯৮৫-১০১৪ খ্রি.), জন্মনাম অরুলমোঝিবর্মন্, ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসকদের অন্যতম। তাঁর রাজত্বে চোল সাম্রাজ্য সমগ্র তামিলনাড়ু, কেরল, কর্ণাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশের অংশ, উত্তর শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। তাঁর নৌ-অভিযান বঙ্গোপসাগরে চোল শক্তি প্রক্ষেপণ করে।

বৃহদীশ্বর মন্দির নির্মাণ কেবল ভক্তির কাজ ছিল না, এটি ছিল সাম্রাজ্যিক সার্বভৌমত্বের ঘোষণা। রাজরাজ মন্দিরের নাম রাখলেন “রাজরাজেশ্বরম্” — “রাজরাজের ঈশ্বরের মন্দির” — স্পষ্টভাবে তাঁর রাজকীয় পরিচিতিকে শিবের দিব্য কর্তৃত্বের সাথে যুক্ত করে।

সাম্রাজ্যিক মহাফেজখানা হিসেবে মন্দির

বৃহদীশ্বর মন্দিরের দেয়ালে রাজরাজ চোল প্রথমের ৬৪টি ও তাঁর পুত্র রাজেন্দ্র চোল প্রথমের ২৯টি শিলালিপি উৎকীর্ণ। ১০১১ খ্রিস্টাব্দের একটি উল্লেখযোগ্য শিলালিপি ৬০০-এরও বেশি ব্যক্তির তালিকা দেয় যারা মন্দিরে সেবা করতেন — পুরোহিত, প্রদীপ প্রজ্বালক, ধোপা, দর্জি, স্বর্ণকার, কুম্ভকার, সূত্রধর, নর্তক, গায়ক ও বাদক।

স্থাপত্য: গ্র্যানাইটে প্রকৌশল বিস্ময়

বিমান: স্বর্গস্পর্শী

মন্দিরের বিমান (গর্ভগৃহ শিখর) এর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য। ১৩টি ক্রমশ সংকুচিত স্তরে (তালা) ২১৬ ফুট উচ্চতায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, এটি সম্পূর্ণরূপে গ্র্যানাইট দিয়ে — ১,৩০,০০০ টনেরও বেশি — গাঁথুনি ছাড়াই নির্মিত। গ্র্যানাইট ব্লকগুলি একটি ইন্টারলকিং পদ্ধতিতে নিখুঁতভাবে কাটা ও জোড়া, যা এক সহস্রাব্দেরও বেশি সময় ধরে কাঠামোর অখণ্ডতা বজায় রেখেছে।

সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকৌশল রহস্য হলো কূটম (শীর্ষপ্রস্তর) স্থাপন — একটি অষ্টভুজাকৃতি গ্র্যানাইট খণ্ড যার ওজন আনুমানিক ৮০ টন — ২১৬ ফুট শিখরের চূড়ায়। প্রচলিত পণ্ডিত তত্ত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢালু র‌্যাম্পের ব্যবহার অনুমান করে, যার সাহায্যে হাতি, কপিকল ও মানব শ্রম দিয়ে শীর্ষপ্রস্তর ধীরে ধীরে টেনে তোলা হয়েছিল।

ছায়াহীন শিখর

মন্দিরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গুণগুলির একটি হলো বিমানের ছায়া-সংক্রান্ত আচরণ। বিষুবকালে দুপুরে শিখর মাটিতে কোনো ছায়া ফেলে না — এই ঘটনা শিখরের ক্রমশ সরু হওয়া, এর স্তরগুলির কোণ এবং সূর্যের পথের সাপেক্ষে এর সারিবদ্ধতার সুনির্দিষ্ট গণনায় অর্জিত। এটি চোল স্থপতিদের জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যামিতির উন্নত জ্ঞান প্রমাণ করে।

মন্দির চত্বর

প্রায় ৪০ একরে বিস্তৃত মন্দির চত্বরে রয়েছে গর্ভগৃহ (ভারতের বৃহত্তম শিব লিঙ্গগুলির অন্যতম), নন্দী মণ্ডপ (একটি খণ্ড গ্র্যানাইট থেকে খোদিত প্রায় ৪.৯ মিটার দীর্ঘ ও ৪ মিটার উঁচু বিশাল নন্দী মূর্তি), মহামণ্ডপ, এবং বিশাল স্তম্ভযুক্ত প্রাকার। গণেশ, সুব্রহ্মণ্য (মুরুগন), দেবী (পেরিয় নায়কী আম্মন) এবং নবগ্রহদের মন্দির মূল মন্দিরকে ঘিরে আছে।

চোল ভিত্তিচিত্র: দিব্যের চিত্রায়ণ

বৃহদীশ্বর মন্দিরের অভ্যন্তরীণ দেয়ালে প্রায় ৬৭০ বর্গমিটার চোল-যুগীয় ফ্রেস্কো চিত্র সংরক্ষিত। বিংশ শতকে নায়ক-যুগীয় চিত্রের স্তরের নিচ থেকে আবিষ্কৃত এই একাদশ শতকের ভিত্তিচিত্রগুলি ৬৩ নায়নমারের (শৈব সন্তদের) কাহিনী, শিবের জীবনের প্রসঙ্গ এবং রাজকীয় শোভাযাত্রার দৃশ্য চিত্রিত করে।

বাঙালি পাঠকদের জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয় যে তাঞ্জাভুর চিত্রকলা (তঞ্জাবুর ওবিয়ম্) — যা এই চোল ভিত্তিচিত্র থেকে বিকশিত হয়েছে — বাংলার পটচিত্র ও কালীঘাট পেইন্টিং ঐতিহ্যের সাথে সমান্তরাল ভারতীয় শিল্পধারা। উভয় পরম্পরাই ধর্মীয় বিষয়বস্তুকে জনমানসের কাছে নিয়ে আসার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।

চোল ব্রোঞ্জ কীর্তি

বৃহদীশ্বর মন্দির ঐতিহাসিকভাবে মোম-ক্ষয় (সিরে পের্দু) ঢালাই কৌশলে নির্মিত অসাধারণ ব্রোঞ্জ উৎসব মূর্তি সংগ্রহের সাথে যুক্ত। চোল ব্রোঞ্জ — বিশেষত প্রতিষ্ঠিত নটরাজ (নৃত্যরত শিব) — মানব সভ্যতায় নির্মিত সর্বশ্রেষ্ঠ ধাতু ভাস্কর্যগুলির মধ্যে স্বীকৃত। আনন্দ তাণ্ডব (আনন্দের নৃত্য) নৃত্যরত শিবকে ব্রহ্মাণ্ডিক অগ্নিবলয়ে চিত্রিত করা নটরাজ ভারতীয় শিল্পের সবচেয়ে সুপরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে।

শাস্ত্রীয় ও ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি

বৃহদীশ্বর মন্দির শৈব আগমের — বিশেষত কামিকাগম ও কারণাগমের — বিধান অনুসারে নির্মিত। তামিল শৈবধর্মকে ৬৩ নায়নমার গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, যাঁদের রচনা তেবারম ও তিরুবাচকম হিসেবে সংকলিত। রাজরাজ চোল প্রথম তেবারমের পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন: পরম্পরা অনুসারে তিনি চিদম্বরম নটরাজ মন্দিরের দেয়ালের ভিতর থেকে বিস্মৃত স্তোত্রগুলি পুনরুদ্ধার করেন।

বাংলার ভক্তি ঐতিহ্যের সাথে তুলনা করলে, নায়নমারদের শৈব ভক্তি চৈতন্য মহাপ্রভুর গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের পূর্বসূরি বলা যায়। উভয় আন্দোলনেই ঈশ্বরের প্রতি নিঃশর্ত প্রেম ও ভক্তির মাধ্যমে মুক্তির পথ দেখানো হয়েছে।

প্রধান উৎসব

মহাশিবরাত্রি

শিবের মহান রাত্রি বৃহদীশ্বর মন্দিরে বিশেষ মহিমায় পালিত হয়। সহস্র ভক্ত সারারাত পূজার জন্য বিশাল প্রাকারে সমবেত হন।

আরুদ্রা দর্শনম্

শিবের ব্রহ্মাণ্ডিক নৃত্য (নটরাজ) উদযাপনকারী এই উৎসব তামিল মাস মার্গঝিতে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) পালিত হয়।

বার্ষিক কুম্ভাভিষেক

মন্দির তার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বহুদিনব্যাপী উৎসবে উদযাপন করে যা ১০১০ খ্রিস্টাব্দে রাজরাজ চোল প্রথম দ্বারা সম্পন্ন মূল কুম্ভাভিষেক (প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠান) পুনরুজ্জীবিত করে।

সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার

তামিল সাংস্কৃতিক চেতনায় বৃহদীশ্বর মন্দির কেবল একটি স্মারক নয় বরং তামিল সভ্যতার অর্জনের জীবন্ত প্রমাণ। এটি দেখায় যে হাজার বছর আগে তামিল প্রকৌশলী, স্থপতি, ভাস্কর ও চিত্রকরেরা এমন প্রযুক্তিগত ও শৈল্পিক পরিশীলিততায় কাজ করতেন যা মানব ইতিহাসের যেকোনো সভ্যতার সমকক্ষ।

উপসংহার: যে পর্বত কখনো পতিত হবে না

রাজরাজ চোল প্রথম ভিত্তি স্থাপনের এক সহস্র বছর পর, বৃহদীশ্বর মন্দির সেই দিনের মতোই অবিচল দাঁড়িয়ে যেদিন তার ৮০ টনের শীর্ষপ্রস্তর চূড়ায় স্থাপিত হয়েছিল। তার বিমান এখনো আকাশ ছুঁতে চায়। তার লিঙ্গে এখনো প্রতিদিন পূজা হয়। তার শিলালিপি এখনো সেই রাজার কণ্ঠে কথা বলে যিনি “দেবাদিদেবের” প্রতি তাঁর ভক্তি ১,৩০,০০০ টন গ্র্যানাইটে ঘোষণা করেছিলেন। যেমন তেবারম ঘোষণা করে: “তঞ্জৈতে প্রভু বিরাজ করেন, কৃপার পর্বত, অচল ও শাশ্বত।” এই মন্দিরই সেই পর্বত।