দেবীমাহাত্ম্য (দেবীমাহাত্ম্যম্, “দেবীর মাহাত্ম্য”), যা দুর্গাসপ্তশতী (“দুর্গার সাতশত শ্লোক”) ও চণ্ডীপাঠ (“চণ্ডীর পাঠ”) নামেও পরিচিত, শাক্ত হিন্দুধর্মের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র — সেই পরম্পরা যা দেবীকে (শক্তি) পরমসত্তা রূপে পূজা করে। ৭০০ সংস্কৃত শ্লোকে ১৩টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই গ্রন্থ মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১–৯৩ অধ্যায় এবং এর রচনাকাল সাধারণত খ্রিষ্টীয় ৫ম–৬ষ্ঠ শতাব্দী বলে গণ্য হয়।

বাঙালি সংস্কৃতিতে এই গ্রন্থের স্থান অতুলনীয়। প্রতি বছর শরতে, মহালয়ার ভোরে যখন আকাশবাণীতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে “যা দেবী সর্বভূতেষু” ধ্বনিত হয়, তখন কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে দুর্গাপূজার আবেগমথিত সূচনা ঘটে। চণ্ডীপাঠ ছাড়া দুর্গাপূজা কল্পনাই করা যায় না — এটি বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসবের আনুষ্ঠানিক মেরুদণ্ড।

পণ্ডিত সি. ম্যাকেঞ্জি ব্রাউন এই গ্রন্থকে বলেছেন “বিভিন্ন দেবীসম্পর্কিত পুরাণকথা, পূজাবিধি ও দার্শনিক উপাদানকে একত্র করে ‘দেবীপরম্পরার কেলাসীভবন’ ঘটানোর গ্রন্থ।” থমাস বি. কোবার্নের মতে, “এটি পৃথিবীর প্রাচীনতম গ্রন্থ যা সম্পূর্ণরূপে একজন স্বতন্ত্র ও উগ্র দেবীর উদ্দেশে নিবেদিত যিনি একই সঙ্গে পরমসত্তা।” এই ক্ষুদ্র কলেবরের গ্রন্থে কমপক্ষে ৬৫টি পরিচিত টীকা রচিত হয়েছে, কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এর পাঠ করেন এবং দেড় সহস্রাব্দ ধরে এটি নবরাত্রি উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।

কথামুখ: রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি

দেবীমাহাত্ম্য একটি সুপরিকল্পিত কথামুখের (frame narrative) মধ্যে উপস্থাপিত। একজন রাজ্যচ্যুত রাজা সুরথ এবং একজন ধনহীন বণিক সমাধি — উভয়েই তাদের পার্থিব অবস্থান থেকে বঞ্চিত — ঋষি মেধসের বনাশ্রমে মিলিত হন। যাদের হাতে তারা প্রবঞ্চিত হয়েছেন, তাদের প্রতি নিজেদের অবিচল আসক্তিতে তারা বিস্মিত।

মেধস ব্যাখ্যা করেন যে এই আসক্তি মহামায়ার কারণে — সেই মহাভ্রম যিনি স্বয়ং পরমা দেবী। তিনিই সেই শক্তি যিনি জীবকে সংসার-চক্রে বাঁধেন এবং তিনিই সেই কৃপা যা তাদের মুক্ত করে। দেবীর মাহাত্ম্য দেখাতে মেধস তিনটি ব্রহ্মাণ্ডীয় চরিত বর্ণনা করেন যেখানে দেবী ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হয়ে বিশ্বব্যবস্থাকে বিপন্নকারী আসুরিক শক্তি ধ্বংস করেন।

এই কথামুখের দার্শনিক তাৎপর্য গভীর: এটি প্রতিষ্ঠা করে যে দেবীর শক্তি অস্তিত্বের প্রতিটি স্তরে ক্রিয়াশীল — দেবাসুর সংগ্রাম থেকে একজন সাধারণ রাজা ও বণিকের দৈনন্দিন মানসিক বন্ধন পর্যন্ত।

তিন চরিত

প্রথম চরিত: মহাকালী ও মধু-কৈটভ বধ (অধ্যায় ১)

প্রথম চরিতে ৬১টি শ্লোক রয়েছে এবং এর অধিষ্ঠাত্রী মহাকালী — দেবীর তামস রূপ। সৃষ্টির আদিতে বিষ্ণু যখন শেষনাগের উপর ক্ষীরসাগরে যোগনিদ্রায় মগ্ন, তখন দুই ভয়ংকর দৈত্য — মধুকৈটভ — বিষ্ণুর কর্ণমল থেকে উৎপন্ন হয়ে বিষ্ণুর নাভিপদ্মে উপবিষ্ট ব্রহ্মার উপর আক্রমণে উদ্যত হয়।

ব্রহ্মা দেবীকে যোগনিদ্রা রূপে স্তুতি করেন এবং প্রার্থনা করেন যেন তিনি বিষ্ণুর দেহ থেকে নিবৃত্ত হন। দেবী নিবৃত্ত হলে বিষ্ণু জাগ্রত হয়ে পাঁচ হাজার বছর যুদ্ধ করেন। অবশেষে মহামায়ার মোহিনী শক্তিতে ভ্রান্ত দৈত্যদ্বয় বিষ্ণুকে বর দিতে চাইলে বিষ্ণু তাদের বধের অনুমতি চান — যা তারা দেয়। বিষ্ণু তাদের নিজ জানুর উপর বধ করেন এবং তাদের মেদ থেকে পৃথিবী (মেদিনী) সৃষ্ট হয়।

গূঢ় তাৎপর্য: স্বামী কৃষ্ণানন্দের মতে, এই পর্ব তমোগুণ — মৌলিক অজ্ঞান, জড়তা ও মন্দতা (মল) — জয়ের প্রতীক। মধু (মাধুর্য/কামনা) ও কৈটভ (তিক্ততা/ক্রোধ) আধ্যাত্মিক জীবনের সবচেয়ে মূলগত বাধা।

মধ্যম চরিত: মহালক্ষ্মী ও মহিষাসুর বধ (অধ্যায় ২–৪)

সর্বাধিক পরিচিত মধ্যম চরিতে ২৫২টি শ্লোক রয়েছে এবং এর অধিষ্ঠাত্রী মহালক্ষ্মী — দেবীর রাজস (বা ত্রিগুণাত্মিকা) রূপ। মহিষদৈত্য মহিষাসুর ব্রহ্মার নিকট বর পেয়েছিলেন যে কোনো দেব বা দানব তাকে বধ করতে পারবে না; এই বরবলে তিনি দেবতাদের পরাজিত করে ইন্দ্রের সিংহাসন অধিকার করেন।

ক্রুদ্ধ দেবতাদের সম্মিলিত তেজস থেকে এক জ্বলন্ত রাশি প্রকাশিত হয় যা থেকে দুর্গা আবির্ভূত হন। প্রতিটি দেবতা নিজ অস্ত্র প্রদান করেন: শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, ইন্দ্রের বজ্র, বরুণের শঙ্খ, অগ্নির শক্তি, বায়ুর ধনুক, সূর্যের বাণ এবং হিমালয় সিংহবাহন দেন। দেবী তাই কোনো একক দেবতার সৃষ্টি নন — তিনি সকল দৈবী শক্তির সম্মিলিত সামর্থ্য থেকে আবির্ভূতা। এটি একটি বৈপ্লবিক দার্শনিক ঘোষণা যে নারীশক্তিই সকল পুরুষশক্তির একীভূত উৎস।

আঠারো দিনের ভীষণ যুদ্ধ চলে। মহিষাসুর মহিষ, সিংহ, হস্তী ও মানবযোদ্ধার রূপ ধারণ করেন, কিন্তু দেবী তাকে পদদলিত করে শূলে বিদ্ধ করেন এবং ছিন্ন মহিষের গ্রীবা থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তে তার শিরশ্ছেদ করেন (দেবীমাহাত্ম্য ৩.৩৭–৩৯)। বাঙালি দুর্গাপ্রতিমায় ঠিক এই মুহূর্তটিই চিত্রিত — দশভুজা দুর্গা সিংহারূঢ়া, মহিষাসুরকে শূলবিদ্ধ করছেন।

গূঢ় তাৎপর্য: এই পর্ব রজোগুণ — মনের চঞ্চল, বিক্ষিপ্তকারী শক্তি (বিক্ষেপশক্তি) — জয়ের প্রতীক। মহিষাসুরের রূপান্তর কামনার পরিবর্তনশীল প্রকৃতির প্রতীক।

উত্তম চরিত: মহাসরস্বতী ও শুম্ভ-নিশুম্ভ বধ (অধ্যায় ৫–১৩)

দীর্ঘতম উত্তম চরিতে নটি অধ্যায়ে ৩৮৭টি শ্লোক রয়েছে এবং এর অধিষ্ঠাত্রী মহাসরস্বতী — দেবীর সাত্ত্বিক রূপ। দুই দৈত্যভ্রাতা শুম্ভনিশুম্ভ ত্রিলোক জয় করেন। দেবতারা হিমালয় শিখরে দেবীর স্তুতি করলে তিনি সুন্দরী অম্বিকা (কৌশিকী) রূপে আবির্ভূতা হন।

এই চরিতের প্রধান পর্বসমূহ:

  • চণ্ড-মুণ্ড বধ: শুম্ভের দুই সেনাপতির বিরুদ্ধে দেবীর ভ্রূকুটি থেকে আবির্ভূতা হন ভয়ংকরী কালী (চামুণ্ডা) — কৃষ্ণবর্ণা, কৃশকায়া, মুণ্ডমালাধারিণী, অট্টহাসকারিণী (৫.২৪–৩৩)। বাঙালি শিল্পে কালীর এই রূপটিই কালীপূজার প্রতিমায় চিরন্তনভাবে মূর্ত।

  • রক্তবীজ বধ: এক দৈত্য যার রক্তের প্রতিটি বিন্দু মাটিতে পড়লে নতুন দৈত্য জন্মায়। দেবী সপ্তমাতৃকা — ব্রাহ্মী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী, নারসিংহী ও ঐন্দ্রী — আবির্ভূত করেন। কালী রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই পান করে দৈত্যকে গ্রাস করেন (৮.৪৯–৬২)।

  • অন্তিম সংগ্রাম: নিশুম্ভ প্রথমে নিহত হন। শুম্ভ দেবীকে অন্য দেবীদের সহায়তা নেওয়ার অভিযোগ করলে দেবীর পরম দার্শনিক উদ্ঘোষ হয়: “একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা। পশ্যৈতা দুষ্ট ময়্যেব বিশন্ত্যো মদ্বিভূতয়ঃ॥” (১০.৫) — “এই জগতে আমি একাই আছি; আমার ব্যতীত দ্বিতীয়া কে? দেখ, হে দুষ্ট, এই সকল আমারই বিভূতি আমাতে প্রবেশ করছে!” সকল দেবী তাঁতে বিলীন হন এবং তিনি একাই শুম্ভ বধ করেন।

গূঢ় তাৎপর্য: এই পর্ব সূক্ষ্মতম বাধা — সত্ত্বগুণেরও আবরণশক্তি — জয়ের প্রতীক। শুম্ভ (আত্মাভিমান) ও নিশুম্ভ (আত্মহীনতা) মুক্তির পথের শেষ অহংকার-বাধা।

প্রধান স্তুতিসমূহ

যা দেবী সর্বভূতেষু (অধ্যায় ৫.৯–৮২)

সর্বাধিক প্রচলিত স্তুতি: “যা দেবী সর্বভূতেষু [গুণ]-রূপেণ সংস্থিতা। নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ॥” — এই স্তুতি দেবীকে সকল জীবে চেতনা (চিতি), নিদ্রা, ক্ষুধা, ছায়া, শক্তি, তৃষ্ণা, ক্ষান্তি, লজ্জা, শান্তি, শ্রদ্ধা, কান্তি, লক্ষ্মী, স্মৃতি, দয়া, তুষ্টি, মাতৃ ও ভ্রান্তি রূপে বিদ্যমান বলে ঘোষণা করে।

এটি দার্শনিকভাবে বৈপ্লবিক: শুধু মহৎ গুণেই নয়, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভ্রান্তি — অভিজ্ঞতার প্রতিটি মাত্রায় দেবীর উপস্থিতি ঘোষিত। মহালয়ার ভোরে এই স্তুতির প্রতিটি পঙ্‌ক্তি যখন রেডিওতে ধ্বনিত হয়, তখন প্রতিটি বাঙালি গৃহে এক পবিত্র আবেশ ছড়িয়ে পড়ে।

অপরাজিতা স্তুতি (অধ্যায় ৪)

মহিষাসুর বধের পর দেবতাদের গীত স্তোত্র — দেবীকে অপরাজিতা, সৃষ্টি ও প্রলয়ের উৎস রূপে বন্দনা।

নারায়ণী স্তুতি (অধ্যায় ১১)

দেবীকে নারায়ণী সম্বোধন করে বিষ্ণুর পরমশক্তি ও ব্রহ্মাণ্ডের আশ্রয় রূপে স্তুতি।

দেবীর প্রতিশ্রুতি (অধ্যায় ১২)

অন্তর্ধানের পূর্বে দেবী ভবিষ্যতে দানবদের উপদ্রবে পুনরাবির্ভাবের প্রতিশ্রুতি দেন এবং শতাক্ষী, শাকম্ভরী, ভীমাভ্রামরী রূপে ভবিষ্যৎ অবতারের ভবিষ্যদ্বাণী করেন।

দার্শনিক তাৎপর্য: পরমসত্তা রূপে দেবী

দেবীমাহাত্ম্যের দার্শনিক নবত্ব হলো এর নির্ভীক ঘোষণা যে দেবীই পরমব্রহ্ম — কোনো সহধর্মিণী নন, কোনো পুরুষ দেবতার অধীনস্থ শক্তি নন, বরং স্বতন্ত্র, স্বয়ম্ভু পরমতত্ত্ব। এই গ্রন্থ কয়েকটি কৌশলে এটি প্রতিষ্ঠা করে:

  1. পরম্পরাসমূহের সমন্বয়: বৈদিক (বাক্, রাত্রি), মহাকাব্যিক (দুর্গা, কালী) ও স্থানীয় মাতৃদেবী পরম্পরাকে একক পরমা দেবীতে একীভূত করে একেশ্বরবাদী দেবীদর্শনের প্রতিষ্ঠা।

  2. দার্শনিক সমন্বয়: সাংখ্যের পুরুষপ্রকৃতি উভয়কেই দেবী রূপে চিহ্নিত করে সাংখ্যদ্বৈতবাদকে শাক্ত অদ্বৈতবাদে রূপান্তর।

  3. মহামায়া তত্ত্ব: দেবী একই সঙ্গে মায়া (বন্ধনের শক্তি) ও বিদ্যা (মুক্তির শক্তি) — এই অবস্থান শাক্তদর্শনকে অদ্বৈত বেদান্তের মায়াবিষয়ক নিছক নেতিবাচক দৃষ্টি থেকে পৃথক করে।

  4. অদ্বৈত ঘোষণা (১০.৫): “আমি একাই জগতে আছি” — এটি শাক্তদর্শনের সর্বোচ্চ দার্শনিক মুহূর্ত।

আনুষ্ঠানিক ব্যবহার: নবরাত্রি পাঠ ও চণ্ডীহোম

নবরাত্রি পারায়ণ

দেবীমাহাত্ম্যের সম্পূর্ণ পাঠ (পারায়ণ) শারদ নবরাত্রির (সেপ্টেম্বর–অক্টোবর) কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান। ১৩টি অধ্যায়ের নয় রাত্রে বিন্যাস:

  • প্রথম দিন: অধ্যায় ১ (মহাকালী চরিত)
  • দিন ২–৩: অধ্যায় ২–৪ (মহালক্ষ্মী চরিত)
  • দিন ৪–৯: অধ্যায় ৫–১৩ (মহাসরস্বতী চরিত)

পাঠের পূর্বে কবচ, অর্গলাকীলক — তিনটি সহায়ক গ্রন্থ — এবং নবার্ণ মন্ত্র (ঐং হ্রীং ক্লীং চামুণ্ডায়ৈ বিচ্চে) জপ করা হয়।

চণ্ডীহোম

চণ্ডীহোম সর্বাধিক বিস্তৃত অনুষ্ঠান যেখানে ৭০০ শ্লোকের প্রতিটি পাঠ করে অগ্নিতে আহুতি দেওয়া হয়। শতচণ্ডী যজ্ঞে বহু পুরোহিত কয়েক দিন ধরে ১০০ বার সম্পূর্ণ পাঠ করেন; সহস্রচণ্ডীতে ১,০০০ বার — কেবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে।

বাংলার দুর্গাপূজা: চণ্ডীপাঠ ও মহালয়া — বাঙালির প্রাণের সম্পদ

বাংলায় দেবীমাহাত্ম্যের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রিকতা যে কোনো অঞ্চলের তুলনায় সর্বাধিক গভীর ও ব্যাপক। চণ্ডীপাঠ (চণ্ডীপাঠ) দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক মেরুদণ্ড — এটি ছাড়া পূজা অসম্পূর্ণ।

মহালয়া: বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমর কণ্ঠ

বাঙালি সংস্কৃতির সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী পরম্পরাগুলির একটি হলো মহালয়ার ভোরের বেতার সম্প্রচার। ১৯৩১ সাল থেকে আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র মহালয়ার প্রত্যুষে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে আসছে — চণ্ডীপাঠ, বাংলা ভক্তিগীতি ও নাট্যভাষ্যের ৯০ মিনিটের এক অভূতপূর্ব শ্রব্য সংকলন।

এই অনুষ্ঠানকে কালজয়ী করেছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র (১৯০৫–১৯৯১)। ১৯৩১ সালে বাণীকুমারের রচনা, পঙ্কজকুমার মল্লিকের সংগীত পরিচালনা এবং ভদ্রের ভাষ্য — এই ত্রয়ী সম্মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছিলেন বাংলার এক অমূল্য সাংস্কৃতিক সম্পদ। ১৯৬৬ সাল থেকে পূর্বরেকর্ডকৃত সংস্করণে সম্প্রচারিত হচ্ছে।

এই সম্প্রচারটি বাঙালি পরিচয়ে এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে ১৯৭৬ সালে যখন আকাশবাণী ভদ্রের সংস্করণের পরিবর্তে অভিনেতা উত্তমকুমারের কণ্ঠে নতুন রেকর্ডিং দুর্গা দুর্গতিহারিণী নামে সম্প্রচার করেছিল, তীব্র জনক্ষোভে অচিরেই মূল সংস্করণে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। আজও কোটি কোটি বাঙালি মহালয়ার ভোর চারটায় জেগে ওঠেন ভদ্রের সেই রেকর্ডকৃত কণ্ঠ শুনতে — “যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা” — এবং সেই মুহূর্তেই শুরু হয় তাদের হৃদয়ে দুর্গাপূজার আবেগময় যাত্রা। নব্বই বছরেরও অধিক সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্প্রচারিত এটি বিশ্বের দীর্ঘতম চলমান বেতার অনুষ্ঠানগুলির অন্যতম।

দুর্গাপূজায় চণ্ডীপাঠের আনুষ্ঠানিক ভূমিকা

দুর্গাপূজার পাঁচ দিন — ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত — প্রতিটি পূজা প্যান্ডেলে পুরোহিত চণ্ডীপাঠ করেন। বোধন, অধিবাস, ষষ্ঠীপূজা, নবপত্রিকাসহ সপ্তমীপূজা, মহাষ্টমীতে কুমারীপূজা ও সন্ধিপূজা, নবমীহোম এবং চূড়ান্ত বিজয়াদশমীতে সিঁদুর খেলা ও বিসর্জন — প্রতিটি পর্বে চণ্ডীপাঠ সম্পৃক্ত। পুরোহিত শুধু পাঠ করেন না — তিনি মহাজাগতিক নাটককে অনুষ্ঠানিক পরিসরে সংস্থাপিত করেন এবং সমগ্র সম্প্রদায় দেবীর অধর্ম-বিজয়ে অংশগ্রহণ করে।

বাংলার শাক্ত পরম্পরা ও দেবীমাহাত্ম্য

বাংলায় শাক্ত পরম্পরার গভীরতা অন্যত্র দুর্লভ। তারাপীঠ, কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর, কামাখ্যা — এই সকল শক্তিপীঠে দেবীমাহাত্ম্যের পাঠ নিত্যকর্ম। বাংলার তান্ত্রিক পরম্পরায়, বিশেষত কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের (১৬শ শতাব্দী) পর থেকে, চণ্ডীপাঠ তান্ত্রিক সাধনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। বাংলার গ্রামে গ্রামে আজও চণ্ডীমণ্ডপ বিদ্যমান যেখানে নিত্য বা পাক্ষিক চণ্ডীপাঠ অনুষ্ঠিত হয়। রামপ্রসাদ সেন (১৭১৮–১৭৭৫) ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের (১৭৭২–১৮২১) শ্যামাসংগীত দেবীমাহাত্ম্যের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সরাসরি উৎসারিত।

প্রধান টীকাসমূহ

কমপক্ষে ৬৫টি পরিচিত টীকার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ:

  1. গুপ্তবতীভাস্করারায় মাখিন (আনু. ১৬৯০–১৭৮৫): সর্বাধিক প্রভাবশালী শাক্ত টীকা, শ্রীবিদ্যা তন্ত্র ও কৌল পরম্পরার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা। ভাস্করারায় প্রমাণ করেন যে চণ্ডিকা পরম অদ্বৈত ব্রহ্ম।

  2. শান্তনবী (চতুর্ধরী): প্রাচীনতম টীকাগুলির অন্যতম — ব্যাকরণগত ও কাহিনিমূলক বিশ্লেষণ।

  3. নাগোজী ভট্টের টীকানাগেশ ভট্ট (আনু. ১৬৭৮–১৭৫৫): বারাণসীর বিখ্যাত বৈয়াকরণের অদ্বৈতমুখী ব্যাখ্যা।

  4. দুর্গাপ্রদীপ, রামশ্রমী, পুষ্পাঞ্জলি, দামোদ্ধরা: ঐতিহ্যগত “সপ্তটীকায়” গণিত।

শাক্তদর্শনে প্রভাব

দেবীমাহাত্ম্যকে “শাক্তদর্শনের সনদ” বলা হয়। এটি পরবর্তী সকল শাক্ত সাহিত্যের ভিত্তিশিলা স্থাপন করেছে:

  • দেবীভাগবত পুরাণ (আনু. ৯ম–১৪শ শতাব্দী) এর দর্শনকে পূর্ণাঙ্গ পৌরাণিক কাঠামোয় বিস্তৃত করে।
  • দেবী উপনিষদসমূহ (দেবী অথর্বশীর্ষসহ) এর দার্শনিক দৃষ্টি থেকে অনুপ্রাণিত।
  • শ্রীবিদ্যাকৌল তান্ত্রিক পরম্পরা একে প্রধান আনুষ্ঠানিক গ্রন্থ রূপে গ্রহণ করে।
  • দেবীগীতা গীতার কাঠামোয় দেবীকে পরম উপদেশিকা রূপে প্রতিষ্ঠা করে।

শিল্পকলা ও মূর্তিতত্ত্বে প্রভাব

দেবীমাহাত্ম্য হিন্দু ধর্মীয় শিল্পকলার সর্বাধিক উর্বর উৎসগুলির অন্যতম:

  • মূর্তিকলা: প্রতিষ্ঠিত মহিষাসুরমর্দিনী প্রতিমা — মহাবলিপুরম থেকে ইলোরা পর্যন্ত — অধ্যায় ২–৪ থেকে সরাসরি অনুপ্রাণিত। পল্লব (৭ম শতাব্দী), চোল (১১শ শতাব্দী) ও হোয়সল (১২শ শতাব্দী) যুগের কৃতিসমূহ শ্রেষ্ঠ।

  • পটচিত্র ও লোকশিল্প: বাংলার পটচিত্র পরম্পরায় দেবীমাহাত্ম্যের কাহিনি এক প্রধান বিষয়। মেদিনীপুর ও বীরভূমের পটুয়ারা দুর্গার মহিষাসুর বধ, কালীর আবির্ভাব ও রক্তবীজ বধের দৃশ্য আঁকেন এবং গান গেয়ে কাহিনি বর্ণনা করেন — এটি দেবীমাহাত্ম্যের জীবন্ত লোকায়ত রূপ।

  • দুর্গাপূজার প্রতিমা: বাংলার দশভুজা দুর্গা — সিংহারূঢ়া, মহিষাসুরকে শূলবিদ্ধ করছেন, পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকেয় — দেবীমাহাত্ম্য কাহিনির প্রত্যক্ষ ভাস্কর্যগত রূপান্তর। কুমোরটুলি থেকে শিল্পাড়া, প্রতিটি মৃৎশিল্পীর হাত এই গ্রন্থেরই জীবন্ত শিল্পগত উত্তরাধিকার বহন করে।

  • পাহাড়ি চিত্রকলা: কাংড়া, গুলের ও বাসোহলি শৈলীর অসংখ্য দেবীমাহাত্ম্য পাণ্ডুলিপি চিত্র LACMA, মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম, ব্রুকলিন মিউজিয়াম ও জাতীয় জাদুঘর নয়াদিল্লিতে সংরক্ষিত আছে।

গ্রন্থের চিরন্তন শক্তি

দেবীমাহাত্ম্য হিন্দু শাস্ত্রে এক অনন্য স্থান অধিকার করে। এটি একই সঙ্গে পৌরাণিক কাহিনি, দার্শনিক প্রবন্ধ, আনুষ্ঠানিক পদ্ধতি, স্তোত্রসংকলন এবং জীবন্ত আনুষ্ঠানিক গ্রন্থ। শাক্ত পরম্পরার জন্য এটি তাই যা বৈষ্ণব পরম্পরার জন্য ভগবদ্গীতা — মূলভিত্তি গ্রন্থ, প্রথম আশ্রয়, যে দৃষ্টিভঙ্গিতে সমগ্র সত্তাকে বোঝা যায়।

বাঙালি সংস্কৃতির জন্য তো এর তাৎপর্য আরও গভীর ও ব্যক্তিগত। মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে “যা দেবী সর্বভূতেষু” শুনতে শুনতে যে শিহরণ জাগে, পূজামণ্ডপে ধুপের গন্ধে চণ্ডীপাঠের মন্ত্রধ্বনি শুনতে শুনতে যে আবেশ আসে, কুমোরটুলির কারিগরের হাতে গড়ে ওঠা দশভুজা প্রতিমায় যে মহিষাসুরমর্দিনী দেখা যায় — সেই সবকিছুর মূলে আছে এই পনেরো শতাব্দী প্রাচীন গ্রন্থ। দেবীমাহাত্ম্য আজও সেই যা চিরকাল ছিল — দেবীর জীবন্ত বাণী, তাঁর ভক্তদের বন্ধন থেকে মুক্তির পথে আহ্বান করছেন।