দুর্গাপূজা (Durgā Pūjā), যা দুর্গোৎসব নামেও পরিচিত, বাংলার সবচেয়ে মহান ও সাংস্কৃতিকভাবে সর্বাধিক সংজ্ঞায়ক উৎসব — একটি বার্ষিক শারদীয় মহোৎসব যা পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ এবং বিশ্বজুড়ে বাঙালি সম্প্রদায়কে পূজা, শিল্প, সংগীত, নাটক, পাকশিল্প এবং সামূহিক আনন্দের পাঁচ দিনব্যাপী কার্নিভালে রূপান্তরিত করে। ২০২১ সালে ইউনেস্কো “কলকাতার দুর্গাপূজা”কে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, একে “সামাজিক শ্রেণীর সীমানা অতিক্রম করে বিভিন্ন পটভূমির মানুষকে একত্রিত করার” উৎসব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ধর্মতাত্ত্বিক কেন্দ্রে, দুর্গাপূজা দেবী দুর্গার — শক্তির (দিব্য নারীশক্তি) সর্বোচ্চ মূর্তিমান রূপ — মহিষাসুরের ওপর বিজয় উদযাপন করে, যেমনটি দেবীমাহাত্ম্যে (দুর্গা সপ্তশতী বা চণ্ডী) বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় — এটি বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মা, একটি বার্ষিক সৃজনশীল বিস্ফোরণ যা বিশ্বের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু জনশিল্প সৃষ্টি করেছে।
পৌরাণিক কাহিনি: দেবীমাহাত্ম্য ও মহিষাসুরবধ
মহিষাসুরের উত্থান
দুর্গাপূজার পৌরাণিক ভিত্তি দেবীমাহাত্ম্য (আনুমানিক ৫ম-৬ষ্ঠ শতক খ্রিস্টাব্দ) — মার্কণ্ডেয় পুরাণের ৮১–৯৩ অধ্যায়ে সংকলিত ৭০০ শ্লোকের সংস্কৃত গ্রন্থ। মহিষাসুর ব্রহ্মার থেকে কঠোর তপস্যার মাধ্যমে বরদান লাভ করেছিলেন যে কোনো দেব বা অসুর তাকে বধ করতে পারবে না। এই বরে বলীয়ান হয়ে সে ত্রিলোক জয় করল, দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করল, এবং ইন্দ্রের সিংহাসন দখল করল (দেবীমাহাত্ম্য ২.১–২২)।
দেবী দুর্গার আবির্ভাব
পরাজিত দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবের কাছে গেলেন। তাঁদের সম্মিলিত ক্রোধ থেকে এক বিশাল তেজঃপুঞ্জ প্রকট হলো যা এক মহিমান্বিত দেবীর রূপ ধারণ করল। প্রতিটি দেবতা তাঁর নির্দিষ্ট শক্তি ও অস্ত্র প্রদান করলেন — শিব ত্রিশূল, বিষ্ণু চক্র, ইন্দ্র বজ্র, বরুণ শঙ্খ, অগ্নি শক্তি, বায়ু ধনুক, সূর্য বাণ, বিশ্বকর্মা পরশু ও কবচ, এবং হিমালয় সিংহ বাহন। এভাবে জন্মগ্রহণ করলেন দুর্গা — “অজেয়া” (দেবীমাহাত্ম্য ২.৯–৩০)।
দেবীমাহাত্ম্যের ঘোষণা: “যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা” — “যিনি সকল প্রাণীতে শক্তিরূপে বিরাজিতা” (৫.১৪–২৮)।
যুদ্ধ ও বিজয়
দুর্গা ও মহিষাসুরের যুদ্ধ দেবীমাহাত্ম্যের ২-৪ অধ্যায়ে বর্ণিত। মহিষাসুর বহু রূপ ধারণ করল — মহিষ, সিংহ, মানুষ, হাতি — এবং অবশেষে মহিষরূপে ফিরে এল। চরম মুহূর্তে, যখন মহিষাসুর কাটা মহিষের গ্রীবা থেকে বেরিয়ে এল, দুর্গা তাঁর পদতলে তাকে চেপে ধরে ত্রিশূলে বিদ্ধ করলেন এবং খড়গে তার শিরশ্ছেদ করলেন (দেবীমাহাত্ম্য ৩.৩৬–৩৮)।
ঐতিহাসিক উৎপত্তি
মধ্যযুগীয় জমিদারি পূজা
দুর্গাপূজার বৃহৎ সার্বজনীন উৎসব হিসেবে ঐতিহাসিক উৎপত্তি ১৬শ শতকের বাংলার জমিদারদের সাথে যুক্ত। নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় (১৭১০–১৭৮৩) বিস্তৃত দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। অকালবোধন — শরৎকালে দেবীর “অসময়ে জাগরণ” — কৃত্তিবাসী রামায়ণে বর্ণিত রামের লঙ্কাযুদ্ধের পূর্বে দুর্গা আরাধনার সাথে যুক্ত।
পলাশি ও ব্রিটিশ যুগ
১৭৫৭ সালে নবকৃষ্ণ দেব শোভাবাজার রাজবাড়িতে মহাসমারোহে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন এবং রবার্ট ক্লাইভকে আমন্ত্রণ জানান। ১৮-১৯ শতকে কলকাতার বৃহৎ পরিবারগুলি — শোভাবাজার, জোড়াসাঁকো (ঠাকুর), পাথুরিয়াঘাটা, হাটখোলা — সর্বাধিক জাঁকজমকপূর্ণ পূজার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত।
বারোয়ারি (সার্বজনীন) পূজা
২০ শতকের প্রথমদিকে দুর্গাপূজার গণতান্ত্রিকীকরণ ঘটে। ১৯১৯ সালে বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব প্রথম সামুদায়িক পূজাগুলির অন্যতম। স্বদেশী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রাম এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। আজ কলকাতায় প্রতিবছর ৩,০০০-এরও বেশি সামুদায়িক দুর্গাপূজার প্যান্ডেল স্থাপিত হয়।
দশদিনের কাঠামো
মহালয়া: আবাহন
দুর্গাপূজা কার্যত মহালয়ায় (আশ্বিনের অমাবস্যা) শুরু হয়। ১৯৩১ সাল থেকে বাঙালিরা মহালয়ার ভোরে জেগে আকাশবাণীতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে ঐতিহাসিক “মহিষাসুরমর্দিনী” অনুষ্ঠান শোনেন — দেবীমাহাত্ম্যের পাঠ ও দেবীস্তুতি গানের দুই ঘণ্টার মন্তাজ। এই সম্প্রচার বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহালয়া পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে গঙ্গায় তর্পণের দিনও বটে।
ষষ্ঠী থেকে নবমী
- ষষ্ঠী: দেবীর আনুষ্ঠানিক অনাবরণ (বোধন), অধিবাস সংস্কার, এবং মুখদর্শন — প্রতিমার মুখোমুখি সন্দর্শন।
- সপ্তমী: প্রাণপ্রতিষ্ঠা — মন্ত্রোচ্চারণে মৃন্ময়ী প্রতিমায় প্রাণসঞ্চার। নবপত্রিকা — শাদা শাড়িতে জড়ানো নয়টি পবিত্র উদ্ভিদ যা দুর্গার নব রূপের প্রতীক — গঙ্গায় (বা অন্য নদীতে) স্নান করিয়ে দেবীর পাশে স্থাপন। ১০৮ পদ্ম ও ১০৮ নাম পাঠ।
- অষ্টমী: সর্বাধিক নিবিড় পূজার দিন। সন্ধিপূজা — অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে ৪৮ মিনিটব্যাপী — সমগ্র উৎসবের পবিত্রতম মুহূর্ত, যে মহাজাগতিক ক্ষণে দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। ১০৮ প্রদীপ, ১০৮ পদ্ম অর্পিত হয়। ধুনুচি নাচ চরমে পৌঁছায়।
- নবমী: চূড়ান্ত পূজার দিন। মহানবমী হোম, কুমারীপূজা — একটি বালিকাকে দেবীর জীবন্ত প্রকাশরূপে পূজা, বেলুড় মঠে রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃক বিশেষভাবে অনুষ্ঠিত। অঞ্জলি (পুষ্পাঞ্জলি) ও প্রসাদ বিতরণ — খিচুড়ি, লাবড়া, বেগুনি।
বিজয়াদশমী (দশমী): বিদায়
দশম দিন বিজয়াদশমী — বিজয় ও হৃদয়বিদারক বিদায়ের দিন। সকালে সিঁদুর খেলা — বিবাহিত নারীরা পরস্পরের ও দেবীর মুখে সিঁদুর মাখেন, মিষ্টি খাওয়ান, আলিঙ্গন করেন — দেবীকে বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি (শিবের কৈলাস) ফিরে যাওয়ার সময় বিদায় জানান।
তারপর শুরু হয় বিসর্জন শোভাযাত্রা — মৃন্ময়ী প্রতিমা ট্রাক, লরি ও কাঁধে বহন করে ঢাকের তালে নাচতে নাচতে সহস্র ভক্তের শোভাযাত্রায় গঙ্গায় (কলকাতায় হুগলি নদীতে) নিয়ে যাওয়া হয়। “আসছে বছর আবার হবে” — প্রতিশ্রুতি চক্রাকার পুনর্নবায়নের, দেবীর চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের।
প্যান্ডেল শিল্পসংস্কৃতি
কলকাতার দুর্গাপূজার সবচেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্যান্ডেল — দুর্গা প্রতিমা রাখার অস্থায়ী কাঠামো। সামান্য কাপড়ের চাঁদোয়া থেকে শুরু করে আজ প্যান্ডেল বিশ্বের সবচেয়ে অসাধারণ জনশিল্প পরম্পরাগুলির একটি হয়ে উঠেছে। পেশাদার শিল্পীরা পুরাণ, সামাজিক সমস্যা, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত নিমজ্জনমূলক স্থাপত্যশিল্প নির্মাণ করেন। বাগবাজার, কলেজ স্কোয়ার, কুমারটুলি পার্ক, দেশপ্রিয় পার্ক, মহম্মদ আলি পার্ক, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার — প্রতিটি লক্ষ লক্ষ দর্শক আকর্ষণ করে।
ধুনুচি নাচ ও সিঁদুর খেলা
ধুনুচি নাচ দুর্গাপূজার সবচেয়ে দৃশ্যমান অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা আরতির সময় নর্তকরা জ্বলন্ত মাটির পাত্রে (ধুনুচি) — নারকেলের ছোবড়া, কর্পূর ও ধূপ ভরা — ঢাকের বাদ্যে ছন্দোবদ্ধভাবে দুলিয়ে নাচেন। দক্ষ নর্তকরা একাধিক ধুনুচি হাতে, মাথায় এবং দাঁতের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখেন।
সিঁদুর খেলা দশমীর সকালে বাঙালি নারীদের এক অনন্য অনুষ্ঠান — শাদা শাড়িতে লাল পাড়ের বিবাহিত নারীরা পরস্পরের কপালে ও মুখে সিঁদুর মাখেন, মিষ্টি খাওয়ান, আলিঙ্গন করেন — নারীশক্তি ও সৌভাগ্যের আনন্দময় উদযাপন।
ভোগ ও পাকশিল্প
দুর্গাপূজা তার স্বতন্ত্র ভোগ (প্রসাদ) ছাড়া অসম্পূর্ণ — খিচুড়ি, লাবড়া (মিশ্র তরকারি), বেগুনি (ভাজা বেগুন), টমেটো চাটনি, পায়েস। রাস্তায় ফুচকা, ঘুগনি, কাঠি রোল, এবং বাঙালি মিষ্টি — রসগোল্লা, সন্দেশ, মিষ্টি দই, চমচম, পান্তুয়া।
ইউনেস্কো স্বীকৃতি
১৫ ডিসেম্বর ২০২১-এ ইউনেস্কো “কলকাতার দুর্গাপূজা”কে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতি দুর্গাপূজাকে তুর্কি দরবেশ নৃত্য, চীনা ছায়া পুতুলনাট্য এবং স্প্যানিশ ফ্ল্যামেংকোর পাশে স্থান দিয়েছে।
ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য
দুর্গাপূজা শাক্ত ধর্মতত্ত্বের মূল নীতি মূর্ত করে — পরম সত্য দিব্য নারীশক্তি, মহাদেবী। বাঙালিদের কাছে দুর্গাপূজার আবেগময় গভীরতা দেবীকে মেয়ে হিসেবে দেখার রূপকে নিহিত — উমা, হিমালয়ের কন্যা, যিনি প্রতিবছর অল্প কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি আসেন এবং তারপর স্বামী শিবের কাছে কৈলাসে ফিরে যান। বিজয়াদশমীর অশ্রু সত্যিকারের — সেগুলি সবচেয়ে সর্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতাকে দিব্যভাষায় প্রকাশ করে। মা আসেন, মা যান — এবং বাঙালি প্রতিটি বিদায়ে এক নতুন পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি খুঁজে পায়।