সম্পূর্ণ মন্ত্র
ওঁ সহ নাববতু হিন্দু পরম্পরার সর্বাধিক প্রচলিত ও পবিত্র শান্তি মন্ত্রগুলির অন্যতম। এটি তৈত্তিরীয় উপনিষদের দ্বিতীয় অধ্যায় — ব্রহ্মানন্দবল্লী — -র প্রারম্ভে অবস্থিত, যা কৃষ্ণ যজুর্বেদের অঙ্গ। পরম্পরাগতভাবে এই মন্ত্রের পাঠ গুরু ও শিষ্য উভয়ে মিলিতভাবে উপনিষদ অধ্যয়নের পূর্বে করেন। এই মন্ত্র বিদ্যার পবিত্র অনুবন্ধ প্রতিষ্ঠা করে।
দেবনাগরী পাঠ
ॐ सह नाववतु। सह नौ भुनक्तु। सह वीर्यं करवावहै। तेजस्वि नावधीतमस्तु मा विद्विषावहै। ॐ शान्तिः शान्तिः शान्तिः॥
বাংলা অনুবাদ
“ওঁ! তিনি (পরমাত্মা) আমাদের উভয়কে (গুরু ও শিষ্য) একত্রে রক্ষা করুন। তিনি আমাদের উভয়ের পুষ্টি বিধান করুন। আমরা উভয়ে মিলিত হয়ে মহাপরাক্রমে কর্ম করি। আমাদের অধ্যয়ন তেজস্বী ও ফলপ্রসূ হোক। আমরা কখনো পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করি। ওঁ শান্তি, শান্তি, শান্তি।“
শব্দে শব্দে বিশ্লেষণ
এই মন্ত্রের প্রতিটি সংস্কৃত শব্দের গভীর ব্যাকরণগত ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে:
-
ওঁ (Oṁ) — প্রণব, সৃষ্টির আদি ধ্বনি, ব্রহ্মের প্রতীক। প্রতিটি বৈদিক পাঠ ওঁ দিয়ে আরম্ভ ও সমাপ্ত হয়।
-
সহ (saha) — “একত্রে, মিলিতভাবে” — এই শব্দটি মন্ত্রের সম্মিলিত ও সহযোগী প্রকৃতি নির্দেশ করে। গুরু ও শিষ্য উভয়ে একযোগে সমাবিষ্ট।
-
নৌ (nau) — “আমাদের উভয়কে” (প্রথম পুরুষ, দ্বিবচন)। দ্বিবচনের প্রয়োগ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট — এটি বহুবচন নয়, বরং বিশেষভাবে গুরু-শিষ্যের যুগলকে নির্দেশ করে।
-
অবতু (avatu) — “রক্ষা করুন” (অব্ ধাতু, প্রথম পুরুষ, একবচন, লোট্ লকার)। অব্যক্ত কর্তা ব্রহ্ম বা ঈশ্বর, যিনি পরম রক্ষাকর্তা।
-
ভুনক্তু (bhunaktu) — “পুষ্টি বিধান করুন” (ভুজ্ ধাতু, লোট্ লকার)। এটি আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক পুষ্টির ইঙ্গিত — জ্ঞানান্বেষণের জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্জীবনী শক্তি।
-
বীর্যম্ (vīryam) — “পরাক্রম, শক্তি, প্রাণশক্তি” — কেবল শারীরিক বল নয়, বরং বেদান্তিক জিজ্ঞাসার জন্য আবশ্যক আধ্যাত্মিক সংকল্প ও বৌদ্ধিক সামর্থ্য।
-
করবাবহৈ (karavāvahai) — “আমরা উভয়ে করি, আমরা উভয়ে প্রয়াস করি” (কৃ ধাতু, প্রথম পুরুষ, দ্বিবচন, আত্মনেপদ)। পুনরায় দ্বিবচন সহযোগমূলক প্রচেষ্টার উপর জোর দেয়।
-
তেজস্বি (tejasvi) — “তেজোময়, দীপ্তিমান, প্রতিভাসম্পন্ন” — তেজস্ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ প্রকাশ, বৌদ্ধিক প্রতিভা, বা আধ্যাত্মিক দীপ্তি।
-
অধীতম্ (adhītam) — “অধ্যয়ন, যা পঠিত হয়েছে” (অধি + ঈ, কর্মণি ভূতকৃদন্ত)। এটি বিশেষভাবে উপনিষদীয় জ্ঞানকে নির্দেশ করে।
-
অস্তু (astu) — “হোক” (অস্ ধাতু, লোট্ লকার)।
-
মা (mā) — নিষেধাত্মক অব্যয়, “না, কখনো না।”
-
বিদ্বিষাবহৈ (vidviṣāvahai) — “আমরা উভয়ে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি” (বি + দ্বিষ্, দ্বিবচন, আত্মনেপদ)। মা -র সহিত মিলিতভাবে এর অর্থ — “আমরা কখনো পারস্পরিক বৈরিতা পোষণ না করি।”
-
শান্তিঃ (śāntiḥ) — “শান্তি” — তিনবার উচ্চারিত, তিন প্রকারের বিঘ্ন দূরীকরণের জন্য।
ত্রিবিধ শান্তি: বিঘ্ন নিবারণ
মন্ত্রের শেষে শান্তির তিনবার উচ্চারণ নিছক পুনরাবৃত্তি নয় — এটি বেদান্ত দর্শনে স্বীকৃত তিন প্রকারের দুঃখের (তাপত্রয়) বিরুদ্ধে সচেতন প্রার্থনা:
-
আধিদৈবিক তাপ — দৈবিক বা ব্রহ্মাণ্ডীয় শক্তি থেকে উদ্ভূত কষ্ট: প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিকম্প, ঝড়, এবং মানবিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে মহাজাগতিক ঘটনা। প্রথম শান্তিঃ উচ্চস্বরে উচ্চারিত হয়, ঊর্ধ্বমুখী এই ব্রহ্মাণ্ডীয় শক্তিগুলির দিকে নির্দেশিত।
-
আধিভৌতিক তাপ — অন্য প্রাণীদের থেকে উদ্ভূত কষ্ট: হিংস্র পশু, কীটপতঙ্গ, শত্রুভাবাপন্ন ব্যক্তি, বা যেকোনো বাহ্যিক জীব। দ্বিতীয় শান্তিঃ মধ্যম স্বরে উচ্চারিত হয়, চারপাশের পরিবেশের দিকে নির্দেশিত।
-
আধ্যাত্মিক তাপ — নিজের অন্তর থেকে উদ্ভূত কষ্ট: শারীরিক রোগ, মানসিক অশান্তি, আবেগজনিত আলোড়ন, আলস্য, বা সংশয়। তৃতীয় শান্তিঃ মৃদুস্বরে উচ্চারিত হয়, অন্তর্মুখী হয়ে।
আদি শঙ্করাচার্য তাঁর ভাষ্যে স্পষ্ট করেন যে এই তিন উচ্চারণ ব্রহ্মবিদ্যার অধ্যয়নে সমস্ত বিঘ্নের সম্পূর্ণ নিবারণের প্রার্থনা।
তৈত্তিরীয় উপনিষদ: প্রসঙ্গ ও গঠন
তৈত্তিরীয় উপনিষদ প্রধান উপনিষদগুলির মধ্যে প্রাচীনতম ও সর্বাধিক সম্মানিত। এটি তৈত্তিরীয় আরণ্যকের অংশ, যা কৃষ্ণ যজুর্বেদ — চারটি বেদের অন্যতম — -এর সাথে সম্পৃক্ত। উপনিষদটি তিনটি খণ্ডে বিভক্ত, যাদের বল্লী (আক্ষরিক অর্থ “লতা” বা “শাখা”) বলা হয়:
১. শীক্ষাবল্লী (শিক্ষার অধ্যায়)
প্রথম খণ্ডটি বৈদিক উচ্চারণ শাস্ত্র (শীক্ষা) এবং স্নাতক ছাত্রকে গুরুর উপদেশ সম্পর্কিত। এর বিখ্যাত সমাবর্তন উপদেশ — “সত্যং বদ, ধর্মং চর, স্বাধ্যায়ান্ মা প্রমদঃ” (সত্য বলো, ধর্মাচরণ করো, স্বাধ্যায়ে অবহেলা কোরো না) — আজও প্রেরণাদায়ক।
২. ব্রহ্মানন্দবল্লী (ব্রহ্মানন্দের অধ্যায়)
আমাদের শান্তি মন্ত্র — ওঁ সহ নাববতু — এই দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা করে। ব্রহ্মানন্দবল্লীতে পঞ্চকোশের (পাঁচটি আবরণ) বিখ্যাত শিক্ষা রয়েছে: অন্নময় কোশ (স্থূল শরীর), প্রাণময় কোশ (প্রাণ), মনোময় কোশ (মন), বিজ্ঞানময় কোশ (বুদ্ধি), এবং আনন্দময় কোশ (আনন্দ)। এই ক্রমিক অন্তর্যাত্রার মাধ্যমে শিষ্যকে স্থূল থেকে সূক্ষ্মের দিকে, এবং অবশেষে অনন্ত আনন্দস্বরূপ ব্রহ্ম পর্যন্ত পরিচালিত করা হয়।
৩. ভৃগুবল্লী (ভৃগুর অধ্যায়)
তৃতীয় খণ্ডে বরুণ-পুত্র ভৃগুর কাহিনী বর্ণিত, যিনি পিতার পথনির্দেশনা — “যা থেকে সকল প্রাণী জন্মগ্রহণ করে, তাকে জানো” — এবং পুনঃপুনঃ চিন্তনের মাধ্যমে প্রতিটি কোশ অতিক্রম করে অবশেষে আনন্দকে ব্রহ্ম রূপে সাক্ষাৎকার করেন।
গুরু-শিষ্য পরম্পরা
ওঁ সহ নাববতু মন্ত্রটি সমগ্র বৈদিক সাহিত্যে গুরু-শিষ্য সম্পর্কের সম্ভবত সর্বাধিক মর্মস্পর্শী অভিব্যক্তি। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় যেখানে জ্ঞানের প্রবাহ একমুখী — শিক্ষক থেকে ছাত্রের দিকে — সেখানে বৈদিক আদর্শে অধ্যয়ন একটি পারস্পরিক, পবিত্র উদ্যোগ।
পারস্পরিক রক্ষা ও পুষ্টি
মন্ত্রের প্রারম্ভিক প্রার্থনা — “তিনি আমাদের উভয়ের রক্ষা করুন” — অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গুরু কেবল শিষ্যের মঙ্গল কামনা করেন না, শিষ্যও কেবল গুরুর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে না। বরং উভয়ে মিলিত হয়ে পরস্পরের জন্য প্রার্থনা করেন। শঙ্করাচার্য মন্তব্য করেন যে গুরুর অমনোযোগী শিষ্যকে শিক্ষাদানের হতাশা থেকে রক্ষা প্রয়োজন, অন্যদিকে শিষ্যের অনুচিত শিক্ষণ থেকে উদ্ভূত বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা প্রয়োজন। উভয়েই সংবেদনশীল; উভয়েরই ঈশ্বরীয় কৃপা আবশ্যক।
সহযোগমূলক পরাক্রম
“আমরা উভয়ে মিলিত হয়ে পরাক্রমে কর্ম করি” (সহ বীর্যং করবাবহৈ) স্বীকার করে যে ব্রহ্মবিদ্যার সংবহনে উভয় পক্ষের অবিরত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। গুরুকে স্পষ্ট, যথোপযুক্ত দৃষ্টান্ত ও পদ্ধতিতে শিক্ষণ উপস্থাপন করতে হয়। শিষ্যকে শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনে প্রযত্নশীল থাকতে হয়। কেউই একা সফল হতে পারে না।
বিদ্বেষমুক্তি
চূড়ান্ত প্রার্থনা — “আমরা কখনো পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করি” — গুরু-শিষ্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে উদ্ভূত একটি অত্যন্ত মানবিক বিপদকে সম্বোধন করে। শিষ্য যখন গুরুকে চ্যালেঞ্জ করে বা গুরু শিষ্যকে অনুশাসন করেন, তখন ঘর্ষণ দেখা দিতে পারে। মন্ত্রটি পূর্বাহ্নেই এর বিরুদ্ধে দৈব রক্ষা প্রার্থনা করে। শঙ্করাচার্য বলেন যে গুরু ও শিষ্যের মধ্যে বৌদ্ধিক বিদ্বেষ জ্ঞান-সংবহনের সর্বশ্রেষ্ঠ শত্রু। যেখানে বৈরিতা আছে, সেখানে প্রকৃত অধ্যয়ন সম্ভব নয়।
শঙ্করাচার্যের ভাষ্য
আদি শঙ্করাচার্য (আনুমানিক ৭৮৮–৮২০ খ্রি.) তৈত্তিরীয় উপনিষদের উপর বিস্তারিত ভাষ্য রচনা করেছেন। এই শান্তি মন্ত্রের উপর তাঁর বিশ্লেষণ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোকিত করে:
-
অব্যক্ত কর্তা ব্রহ্ম: মন্ত্র যখন বলে “তিনি আমাদের উভয়ের রক্ষা করুন,” এই “তিনি” পরমেশ্বরকে নির্দেশ করে, যিনি ব্রহ্মের সাথে অভিন্ন। শঙ্কর ব্যাখ্যা করেন যে ব্রহ্মের অধ্যয়নের পূর্বে ব্রহ্মেরই কৃপা আবাহন করতে হয় — কেননা কেবল ব্রহ্মের অনুগ্রহেই ব্রহ্মকে জানা সম্ভব।
-
মন্ত্রের উদ্দেশ্য বিঘ্ন-নিবারণ: শঙ্কর এই শান্তি মন্ত্রকে একটি উপাসনা (ধ্যানাত্মক আবাহন) রূপে চিহ্নিত করেন, যার নির্দিষ্ট কাজ উপনিষদীয় অধ্যয়নের সাফল্যে আগত সকল বাধা দূরীকরণ।
-
দ্বিবচন সচেতন: শঙ্কর সমগ্র মন্ত্রে দ্বিবচনের ধারাবাহিক ব্যবহারের (নৌ, আবহৈ ইত্যাদি) প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন — এটি নিশ্চিত করে যে এটি বিশেষভাবে গুরু-শিষ্য যুগলের প্রার্থনা, কোনো সমষ্টির নয়।
-
অধ্যয়নের তেজস্বিতা মানে সাক্ষাৎকার: মন্ত্র যখন প্রার্থনা করে “আমাদের অধ্যয়ন তেজস্বী হোক” (তেজস্বি নাবধীতমস্তু), শঙ্কর তেজস্ -এর ব্যাখ্যা কেবল বৌদ্ধিক তীক্ষ্ণতা রূপে করেন না, বরং সেই রূপান্তরকারী আলোক রূপে যা তখন উদিত হয় যখন শাস্ত্রীয় জ্ঞান সত্যিকার অর্থে আত্মীকৃত হয় — যখন পরোক্ষ জ্ঞান (পরোক্ষ জ্ঞান) অপরোক্ষ জ্ঞান (প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎকার) হয়ে ওঠে।
বাংলায় বিশেষ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
বাংলার সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে এই শান্তি মন্ত্রের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে:
-
বাংলার টোল শিক্ষা: নবদ্বীপ, নদিয়া এবং শান্তিপুরের ঐতিহাসিক সংস্কৃত টোলগুলিতে, যেখানে ন্যায়, ব্যাকরণ ও বেদান্ত শিক্ষা দেওয়া হত, এই মন্ত্রের পাঠ নিত্যকর্মের অংশ ছিল। বিশেষত নবদ্বীপের ন্যায়শাস্ত্রের বিদ্যালয়গুলি, যেখানে রঘুনাথ শিরোমণির মতো পণ্ডিতরা শিষ্যদের শিক্ষাদান করতেন, এই মন্ত্র দিয়ে দৈনিক পাঠ আরম্ভ করতেন।
-
রামকৃষ্ণ মিশন ও বেদান্ত সমিতি: বেলুড় মঠ ও এর শাখাকেন্দ্রগুলিতে এই মন্ত্রটি প্রতিদিন পাঠ করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাবে বাংলায় বেদান্তিক অধ্যয়নের পুনর্জাগরণে এই মন্ত্রের ভূমিকা অপরিসীম।
-
রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরু-শিষ্য পরম্পরার উপনিষদীয় আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। শান্তিনিকেতনের “তপোবন” শিক্ষাপদ্ধতিতে, যেখানে গুরু ও শিষ্য উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে একত্রে অধ্যয়ন করতেন, এই মন্ত্রের মূলভাব প্রতিফলিত হয়।
-
বাংলার বৈষ্ণব পরম্পরা: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর শিষ্যদের গুরু-শিষ্য সম্পর্ক, বিশেষত ষড়গোস্বামীদের সাথে তাঁর আধ্যাত্মিক বন্ধন, এই মন্ত্রের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগের আদর্শের জীবন্ত উদাহরণ।
দৈনিক অনুশীলনে প্রাসঙ্গিকতা
ওঁ সহ নাববতু মন্ত্রটি আজও হিন্দু ধর্মীয় ও শৈক্ষিক জীবনে কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করে:
-
বৈদিক পাঠশালা: প্রতিদিন শাস্ত্রীয় অধ্যয়নের পূর্বে মন্ত্রপাঠ করা হয়, যা সহস্রাব্দ ধরে চলে আসা অখণ্ড মৌখিক পরম্পরাকে জীবিত রাখে।
-
যোগ কক্ষ: সারা বিশ্বে যোগ কক্ষের প্রারম্ভে এই মন্ত্র উচ্চারিত হয়, গুরু ও সাধকের মধ্যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার আমন্ত্রণ জানাতে।
-
হিন্দু সংস্কার: উপনয়ন সংস্কার (পৈতে), গুরু পূর্ণিমা উৎসব, এবং যেকোনো নতুন ধর্মীয় অধ্যয়নের শুভারম্ভে এই মন্ত্রের পাঠ হয়।
-
বেদান্ত কক্ষ: স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ও স্বামী চিন্ময়ানন্দ প্রতিষ্ঠিত সমকালীন অদ্বৈত বেদান্ত শিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রতিটি ক্লাসের আরম্ভে ও শেষে এই মন্ত্রপাঠ অনিবার্য।
এই মন্ত্রের সার্বজনীন আবেদন তার সরল অথচ গভীর দৃষ্টিভঙ্গিতে নিহিত: অধ্যয়ন শোষণ নয়, সহভাগিতা; প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা; এবং সর্বোচ্চ জ্ঞান কেবল পারস্পরিক রক্ষা, পুষ্টি, প্রচেষ্টা, তেজস্বিতা ও শান্তির পরিবেশেই সংবাহিত হতে পারে।
পাঠবিধি ও ছন্দ
ওঁ সহ নাববতু গদ্য (gadya) শৈলীতে রচিত, কোনো নির্দিষ্ট বৈদিক ছন্দে (chandas) নয়। এটি বহু উপনিষদীয় অংশের বৈশিষ্ট্য যা প্রায়শ পদ্য ও গদ্যের মধ্যে বিচরণ করে। শান্তি মন্ত্র হওয়ায় এটি প্রার্থনা শ্রেণিভুক্ত, ঋক্ (স্তুতি মন্ত্র) বা সাম (গানের সুর) শ্রেণিভুক্ত নয়।
বৈদিক পাঠে মন্ত্রটি কৃষ্ণ যজুর্বেদের স্বরিত (স্বরপ্রধান) উচ্চারণ পদ্ধতি অনুসরণ করে। তিনটি শান্তিঃ উচ্চারণ পরম্পরাগতভাবে ক্রমহ্রাসমান স্বরে করা হয় — প্রথমটি উচ্চস্বরে, দ্বিতীয়টি মধ্যম স্বরে, এবং তৃতীয়টি মৃদুস্বরে — যা উপরে বর্ণিত তিন প্রকারের বিঘ্নের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
মন্ত্রটি প্রথাগতভাবে উপনিষদীয় অধ্যয়ন সত্রের আরম্ভে ও শেষে উভয় সময়ে পাঠ করা হয়: আরম্ভে রক্ষা ও আশীর্বাদের আবাহনের জন্য; সমাপনে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও প্রাপ্ত জ্ঞান সুরক্ষিত করার জন্য।